লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও মর্যাদার

45

পবিত্র লাইলাতুল কদর রজনী আজ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) লাইলাতুল কদর তালাশ করার জন্য সম্ভাব্য যে পাঁচটি বেজোড় রাতের কথা বলেছেন তার মধ্যে আজকের দিনগত সাতাশের রাতটি অন্যতম।

আজ সারা রাত মুসল্লিরা ইবাদত-বন্দেগিতে পার করবেন। রোজা পালনকারী ঈমানদাররা চোখের পানি ফেলে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন ও তার জন্য গভীর সেজদায় লুটিয়ে পড়বেন।

সারা রাত নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, তওবা-ইস্তেগফার, দোয়া দরুদ ও দ্বীনি আলোচনায় ব্যস্ত থাকবেন মসজিদে মসজিদে। তাছাড়া যারা মসজিদে আসতে পারবেন না, তারা বাড়িতে পার্থিব সব ব্যস্ততা ঝেড়ে ফেলে পরওয়ারদেগারের কাছে পানাহ চাইবেন এবং নিমগ্ন হবেন প্রভুর ধ্যানে। নারীরাও আজ রাতে ইবাদতে অংশ নিবেন। আমরা জানি রাসূল (সা.)-এর জামানায় নারীরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা ও ঈদের নামাজে হাজির হতেন।

এমনকি রমজানের শেষ ১০ দিন মসজিদে তাঁবু স্থাপন করে ইতিকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল কদরও তালাশ করতেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের নারীরা যদি মসজিদে (নামাজ ও ইবাদত-বন্দেগির জন্য) যেতে চায়, তাহলে তোমরা নিষেধ করো না। তবে তাদের জন্য ঘরই উত্তম। কেন না ঘরই তাদের জন্য বেশি পর্দা রক্ষাকারী।

এখানে তাদের একাগ্রতা ও ধ্যান হবে বেশি। আজকের রাতে আমাদের পরিবার-পরিজন সবার উচিত আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করা। কেননা লাইলাতুল কদর এমন একটি রাত যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। মাহে রমজানের বিশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব অনেকাংশে মহিমান্বিত এ রাতের কারণেই বৃদ্ধি পেয়েছে। লাইলাতুল কদর বা শবে কদরের অর্থ হচ্ছে সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ রাত। বছরের যে ক’টি দিন ও রাত বিশেষভাবে মহিমান্বিত, তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম ও বরকতময় হল এ শবে কদর।

পবিত্র রমজানের এ রাতে লাওহে মাহফুজ থেকে নিম্ন আকাশে মহাগ্রন্থ আল কোরআন অবতীর্ণ হয়। কোরআন নাজিলের মাস হিসেবে রমজান যেমন বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত, তেমনি কোরআন নাজিলের কারণেই শবে কদর অতি ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ।

আল্লাহ বলেন, এ কোরআন আমি লাইলাতুল কদরে নাজিল করেছি। অন্য আয়াতে বলেন, রমজান মাস, এ মাসেই কোরআন অবতীর্ণ হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা লাইলাতুল কদরকে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলে অভিহিত করেছেন। এর অর্থ হল, সাধারণ এক হাজার মাস তথা তিরাশি বছর চার মাস প্রতি রাত জাগ্রত থেকে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি নফল ইবাদত করলে যে সওয়াব হবে, এই এক রাতের ইবাদতে তার চেয়েও অনেক বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে। এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা ‘আলফ’ তথা ‘হাজার’ শব্দ ব্যবহার করেছেন।

আলফ আরবি গণনার সর্বোচ্চ সংখ্যা। মুফাসসিররা বলেন, যদি এর চেয়ে বড় আরও কোনো সংখ্যা প্রচলিত থাকত, তাহলে আল্লাহতায়ালা হয়তো তা-ই ব্যবহার করতেন।
এছাড়া শবে কদরের ফজিলত তো আর হাজার মাসের মধ্যে সীমিত করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। তার সঠিক পরিমাণ কত, তা আল্লাহই ভালো জানেন। এখানে সংখ্যার হিসাব মুখ্য নয়, আল্লাহর অশেষ দানটিই প্রধান হিসেবে বিবেচিত হবে।

লাইলাতুল কদর মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মতের জন্য সৌভাগ্য। আর কোনো নবীর উম্মতকে এ ধরনের ফজিলতপূর্ণ কোনো রাত বা দিন দান করা হয়নি। আগেকার নবীদের উম্মতরা অনেক আয়ু পেতেন। এজন্য তারা অনেকদিন ইবাদত করারও সুযোগ পেতেন। সে তুলনায় উম্মতে মোহাম্মদীর আয়ু নিতান্তই কম।

এজন্য আল্লাহতায়ালা তার বিশেষ দয়ায় মহানবী (সা.) এর উম্মতকে মহিমান্বিত এ রাত দান করেছেন। যারা এ রাত
ইবাদত করে কাটাবেন, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কারের ঘোষণা। আল্লাহ চান বান্দা যেন গোনাহ ও পাপমুক্ত হয়ে তার দরবারে হাজির হয়। এজন্য তিনি এ ধরনের বিশেষ তাৎপর্যময় রাত ব্যবস্থা রেখেছেন আমাদের জন্য। আমাদের উচিত এ মহাসুযোগ কাজে লাগিয়ে আল্লাহর বিশেষ কৃপা ও অনুগ্রহ লাভে নিজেকে ধন্য করা।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, একবার আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল (সা.) আমি যদি জানতে পারি যে, কোন রাতটা কদরের; তাহলে ওই রাতে আমি কী বলবো? তিনি বললেন, এ দোয়া বলবে, আল্লা-হুম্মা ইন্নাকা আফূওউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাআফূআন্নী। (হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাময়। তুমি ক্ষমা করা ভালোবাসো। অতএব, আমাকে ক্ষমা করো।’ (তিরমিজি, মিশকাত)। আল্লাহতায়ালা আমাদের শবেকদরের ফজিলত ও বরকত দান করুন। আমিন!

লেখক: মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি।