বিদআত: এক‌টি পর্যা‌লোচনা

409
বিদআত: এক‌টি পর্যা‌লোচনা

সব কিছুতে বিদআত খোঁজা ঠিক নয়, বর্তমানে কিছু লোক সবকিছুতেই বিদআত খোঁজে বেড়ায়, বিদআতের দূর্গন্ধ পায়। এটা বিদআত, ওটা ‌বিদআত, তার কা‌ছে সবই বিদআত ম‌নে হয়। তার চশমার আয়নায় বেদআতই শুধু ধরা প‌রে। বস্তুর উপ‌রের অংশ দে‌খেই ব‌লে – নাহ, এটা ভা‌লো না । ত‌লি‌য়ে দেখার কোনরূপ চেষ্টা ক‌রে না, আস‌লে বিষয়টা কী। এ সকল অবান্তর বিদআত খোঁজার প্রয়াস (?) আজ আমা‌দের সমা‌জে এক ধর‌ণের লো‌কের মজ্জাগত বিষ‌য়ে প‌রিণত হ‌য়ে‌ছে। সর্বত্র তা‌দের চো‌খে বিদআতই প‌ড়ে।বস্তুত শরীয়া‌তের উসূল ও নীতি সম্পর্কে পূর্ণ বুৎপ‌ত্তি না থাকলে যা হয় আর কি! এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচরা করার প্রায়াস পাব ইন্ শা আল্লাহ। বিদআ‌তের প‌রিচয়, হাদীস শরীফে বিদআতের উসূল হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হ‌য়ে‌ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد. আমাদের দ্বীনে নেই, এমন কিছু দ্বীনে প্র‌বিষ্ট করালে তা প্রত্যাখ্যাত হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস-২৬৯৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস-৪৪৫৬) অন্য হাদীসে এসেছে, شر الأمور محدثاتها،وكل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة. সবচে নিকৃষ্ট বিষয় হলো, নব আবিষ্কৃত বিষয়, আর নব আবিষ্কার হলো বিদআত। আর সমস্ত বিদআতই গোমরাহী। (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১৯৭৬) ইসলামী শরীয়তে বিদআতের প্রয়োগক্ষেত্র কী তা আমাদের জানা না থাকার কারণেই আজ আমরা সর্বত্র বিদআতের দূর্গন্ধ পাই। দুনিয়ায় এযাবৎ যা কিছু আবিষ্কার হয়েছে সবই কি বিদআত? না; বরং শরীয়ত একটি সীমা-‌রেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে, এর বাই‌রে কোন কিছু হ‌লে তখনই বিদআত হ‌বে। ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন- المحدثات ضربان: ما أحدث ما يخالف كتابا أو سنة أو أثرا أو إجماعا فهذه البدعة الضلالة؛ وما أحدث فيه من الخير لا خلاف فيه لواحد من هذا وهذه محدثة غير مذمومة. বক্তব্যের খোলাসা হলো, কুরআন-সুন্নাহ, সাহাবা এবং ইজমা বিরোধী কোনো কাজ হলে সেটা বিদআত হবে। (জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম-৩৮৭) ইমাম শাতেবী রহ. বলেন, طريقة في الدين مخترعة تضاهي في الشرعية يقصد السلوك عليها المبالغة في التعبد لله سبحانه. অর্থাৎ ইবাদতের উদ্দেশ্যে সাওয়া‌বের আশায় শরীয়তে কোনো কিছু আবিষ্কার করা। (আল-ই’তিসাম-১:৫০) ইমাম শাতেবী বহ. আল-ই’তিসামে বিদআতের প্রয়োগক্ষেত্র ও তার প্রকারভেদ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যার সারকথা হলো, মাকাসেদে দ্বীন তথা দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে কোনো ধরণের নতুন বিষয় প্রবেশ করাতে চাইলে তা বিদআত হবে। আর ওয়াসায়েলে দ্বীন তথা দ্বীনের মৌলিক কার্যাবলী পালনের স্বার্থে যে সব মাধ্যম গ্রহণ করা হয়, সে সব ক্ষেত্রে কম-বেশী করলে তা শরীয়ত কর্তৃক ঘৃণিত বিদআতেরর অন্তর্ভূক্ত হবে না। (বিস্তারিত; আল-ই’তেসাম, মুয়াফাকাত-২:২৫৮) শাব্বীর আহমাদ উসমানী রহ. বলে, أن البدعة الشرعية هي إحداث أمر ليس له ثبوت بواحد من الأصول الأربعة الدينية زاعما أنه من الدين، ومظنة للإثابة من الله والتحسين… وقد ثبت في الأصول أن ما لا يتم الواجب إلا به فهو واجب، وما يتوقف عليه المامور به فهو أيضا مامور به، فهو من الدين حكما، وليس هو من الإحداث في الدين ما ليس منه. বিদআত হলো, দ্বীনের অংশ মনে করে সওয়াবের আশায় এমন কোনো নতুন কাজ করা যার কোন ভিত্তি শরীয়তে নেই। তবে শরীয়তের অবশ্য পালনীয় কোনো ইবাদত পূর্ণতা দেয়ার লক্ষ্যে নতুন কিছু করলে তা বিদআত হবে না। (ফাতহুল মুলহিম-৪:৩৩০) বিদআতের পূর্ণ সংজ্ঞা, البدعة الشرعية الخاصة: هي الزيادة في الدين أو النقص منه، الحادثان بعد الصحابة بغير إذن الشارع به لا قولا، ولا فعلا، ولا صراحة، ولا إشارة فلا يتناول العادات أصلا، بل تقصر على بعض الاعتقادات، وبعض صور العبادات، فهذه هي مراده -صلى الله عليه وسلم- في قوله: كل بدعة صلالة. শরীয়তের দৃষ্টিতে বিদআত বলা হয়, দ্বীনের মধ্যে কম-বেশী করা, যা অস্তিত্ব আসে সাহাবা যুগের পর এবং কুরআন-হাদীসে যার কোনো বৈধতা পাওয়া যায় না। নবিজীর বাণী كل بدعة ضلالة (সকল বিদআতই গোমরাহী) দ্বারা এ বিদআতই উদ্দেশ্য। (আমানিল হাজাহ-৬৪) এখানে الزيادة في الدين বা “দ্বীনের মধ্যে বৃদ্ধি” বলায় দুনিয়াবী যাবতীয় আবিষ্কার বিদআত থেকে বের হয়ে গেল। এবং দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত, কিন্তু দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত নয়, এমন যাবতীয় আবিষ্কারও। শুরুতে উল্লিখিত আয়েশা রা. এর হাদীসে হুবহু একথাটিই বলা হয়েছে যে, নতুন কিছু দ্বীন‌ের মধ্যে অনুপ্রবেশ করা‌তে চাইলে তা প্রত্যখ্যাত হবে। কিন্তু দ্বীনের স্বার্থে কোনো কিছু করা হলে সেটা প্রত্যাখ্যাত নয় । নব আবিষ্কার হলেই যে বিদআত হবে বিষয়‌টি এমন নয় বরং তা ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করলে তা বিদআত হবে। তাই তো ওলামায়ে কেরাম উসূলের কিতাবে বিদআতের আলোচনার এক পর্যায়ে বলেন, البدعة الواجبة (ونحوها) অর্থাৎ এমন নব আবিষ্কার যা করা ওয়াজিব। (দেখুন, ফাতহুল বারী-১৩:৩০৬) সারকথা, হাদীস শরীফের ভাষ্য ও আইম্মায়ে কেরামের বিদআতের সংজ্ঞায়ন দ্বারা সুস্পষ্ট যে, অভ্যাসগত বিষয়, দুনিয়াবী যে কোন আবিষ্কার, আধুনিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদি শরীয়ত কর্তৃক নিন্দিত নব আবিষ্কার বা বিদআতের অন্তর্ভূক্ত নয়। এগুলো ইবাদত হিসেবে আবিষ্কার নয়। এগুলো শরয়ী কোনো হুকুমের মুখালিফ বা বিরোধী নয়। অথবা ইবাদত হিসেবে হলে, যদি তা নবী যুগে, সাহা যুগে বা তাবেয়ী যুগে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, চাই তা স্পষ্ট হোক কিংবা ইঙ্গিতে তা বিদআতের অন্তর্ভূক্ত হবে না। ঠিক তদ্রুপ যেটা দ্বীনী কোন কাজ বা ইবাদত সহজ করণার্থে, কোনো ইবাদতের মাধ্যম বা ওসীলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাও বিদআত হবে না। যদিও তা নবী যুগে, সাহাবা যুগে অথবা তাবেয়ী যুগে না থাকে। অনেক কিছু তখন প্রয়োজন ছিলো না, কিন্তু পরবর্তীতে প্রয়োজন হয়েছে। বিদআত তো হলো, নতুন কিছ দ্বীন‌ের মধ্যে অনুপ্রবেশ করানো, দ্বীনের স্বার্থে কোনো কাজ করা নয়। বিদআত তো হলো, এমন ইবাদত (?) যার কোনো প্রমাণ বা ভিত্তি শরীয়তে নেই। না স্পষ্ট না ইঙ্গিতে। সংক্ষেপে একটি কথা আমরা মনে রাখব البدعة في المقاصد لا في الوسائل (বিদআত হ‌লো দ্বী‌নের ম‌ৌলিক বিষ‌য়ের সা‌থে সং‌যোজন। মাধ্য‌ম অবলম্বন নয়।) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সহীহ বুঝ দান করুন।