মনমুকুরের প্রেয়সী

148

খাবার রেডি। তাড়াতাড়ি এসে পড়ো। ছোটবোন লুবাবা তাসনিমের ডাকে দস্তরখানে উপস্থিত হল আদনান। সাথে সদ্যই এ বাড়িতে নববধূ হয়ে আসা হুমাইরা নাজিফা।

   বাবা, মা,বোন সহ সকলেই খেতে বসেছেন একসাথে। নতুন বাড়িতে হুমায়রার লাজুক ভাবটা এখনো কাটেনি। নতুন বউ বলে কথা। লোকমা কয়েক মুখে দিয়েই খাবার শেষ করেছে সে। বিষয়টি লুবাবার দৃষ্টি এড়ায়নি। প্লেটে করে কিছু খাবার দিয়ে গেল নবদম্পতির সাজানো কামরায়। সুন্দর ছিমছাম একটি রুম। সাজানো গোছানো। ফুলে ফুলে সাজানো শয্যার চারপাশ। লাইটের নিয়ন আলো রুমটিতে তৈরি করেছে এক মায়াবি আবহ,প্রেমময় প্রহেলিকা। খাবার প্লেটটি হাতে নিল আদনান। নিজ হাতে খাবার তোলে দিল হুমায়রার মুখে। ভালবাসার লাজুক আবেশে শিহরিত হুমায়রা। অতীত কল্পনা আর বাস্তবতায় কোন মিল খুঁজে পাচ্ছে না সে।

   অসাধারণ রূপবতী কলেজপড়ুয়া বালিকা হুমায়রা। জীবনসঙ্গী হিসেবে কল্পনা করতো জেনারেল শিক্ষিত কোন ছেলে। তারই কিনা বিয়ে হল মাদরাসাপড়ুয়া আদনানের সাথে। তাকমীল, ইফতা শেষ করে এখন সুনামের সাথে অধ্যাপনা করছে এক মাদরাসায়। শুক্রবারের মিম্বারের দায়িত্বটাও আন্জাম দিচ্ছে দৃঢ়তার সাথে। 

       এমন সভ্যাধুনিক একটি মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে হুমায়রা প্রাণভরে শুকরিয়া আদায় করল আল্লাহর দরবারে। এক নদী স্বপ্ন বুনল হৃদয় -জমিনে। ভাবলেশহীনভাবে বাতায়ন ফাঁক করে আদনান দৃষ্টি নিক্ষেপ করল বাইরের পৃথিবীতে। অবাক বিস্ময়ে দেখল সে,জ্যোৎস্নার সমুদ্রে ভাসছে পৃথিবী। আকাশের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে তারকার ঝাঁক। ভরা পূর্ণিমায় জ্যোৎস্নায় ভিজতে সিঁড়ি ভেঙে তারা উঠল তিনতলার ছাদে। বসল মুখোমুখি দুটি চেয়ারে। পৃথিবীর সমস্ত প্রদীপ নিভে গেছে। থালার মতো একটি চাঁদ ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশের বুকে। পৃথিবীর বুকে আকুল পুলকে নেমে আসছে জ্যোৎস্নাধারা। জ্যোৎস্নার বৃষ্টি ঝরে পড়ছে হুমায়রার চাঁদমুখেও। মাঝেমাঝে স্বল্প পরিমিত হাসি আপেলের রক্তিমাভার মতো ছড়িয়ে পড়ছে মুখের সর্বত্র। গোলগাল মুখের উপর টিকলো নাক,তারি গোড়ায় ছোট একটা তিল। ভাসাভাসা দুটি চোখ।দোহারা গড়ন। মৃদুমন্দ বাতাসের তালে নাচছে কেশরাজি। জীবনের মানচিত্রে এমন দৃশ্য কখনও অনুভব করেনি আদনান। বুভুক্ষ হৃদয়ের সবটুকু মাধুরী মিশিয়ে উদভ্রান্তের মতো চেয়ে রইল হুমায়রার জ্যোৎস্নাধৌত দেহাবয়বের দিকে। 

      নিরবতা ভাঙল আদনান। জীবনাকাশে তোমার মত একটি তারকারই উদয় চেয়েছিলাম। ফিনফিনে বাতাসে হুমায়রার এলোমেলো চুলে আঙুল বুলাতে বুলাতে বলল আদনান। আপনাকে পেয়ে আমিও ধন্য প্রিয়।লজ্জায় আরক্ত ডালিম নিংড়ানো মুখে কথাটা বলেই পরম নির্ভরতায় মাথাটা এলিয়ে দিল আদনানের প্রশস্ত বক্ষে। 

      উন্মুক্ত আকাশের নিচে পণ করলো দুজন,দ্বীনি একটি পরিবার রচনা করবে তারা।যেখানে থাকবে না বদদ্বীনির আঁধার। থাকবে দ্বীনের শুভ্রতার ঝিলিক। কলেজপড়ুয়া হুমায়রার স্বচ্ছ-সুন্দর মানসিকতায় যারপরনাই মুগ্ধ আদনান। গল্পে -গল্পে বেশ রাত হয়েছে। মুগ্ধময় সময়টা কখন যে বাদামতোলা নৌকার মতো ফুরিয়ে গেল,ঠাহরই করতে পারেনি তারা।

   একহাজার এক রাত কেটে যাবে হয়তো,আমাদের গল্প তবু ফুরাবে না। বলল আদনান।

   ঠিক বলছেন প্রিয় বলে আদনানের কথাকে সায় দিল  হুমায়রা।  জ্যোৎস্নাসিক্ত দুটো প্রাণ আগামীর স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে চলে আসল অন্দরমহলে। আনন্দের জোয়ারে ভেসে উঠল ছোট কামরাটি। পূর্বাকাশে শুকতারাটা তখনো জ্বলজ্বল করছে; ঠিক আদনান হুমায়রার জীবনাকাশের শুকতারাদের মতো।

লেখক: উবাইদ উসমান শিক্ষার্থী এবং অনলাইন এক্টিভিস্ট