মিডিয়ায় উপস্থিতির জন্য প্রয়োজন সাহিত্য ও সাংবাদিকতা কোর্স

242

আজ মুসলমানদের হাতে কোন মিডিয়া নেই। এটাই বাস্তবতা। মুসলিম বিশ্বের জন্য এটা বড় ধরণের একটি সঙ্কট। আর শুধুমাত্র এ কারণেই সারা বিশ্বে মুসলিমরা আজ অধিকার বঞ্চিত, নির্যাতিত, নিগৃহিত হওয়া সত্ত্বেও তারাই বিশ্বমিডিয়ার চোখে অপরাধী।

সারা বিশ্বে যত মিডিয়া আছে, যত প্রচার মাধ্যম আছে, তার বড় অংশই নিয়ন্ত্রন করে তিনটি শক্তি।
ক। ইয়াহুদী
খ। অন্যান্য ধর্মাবলম্বী
গ। পাশ্চাত্যের দালাল একটি মুসলিম গোষ্ঠী।

বিশ্বমিডিয়ার প্রধান নিয়ন্ত্রক ইহুদী সম্প্রদায়। তারা আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জন করে জনসংখ্যায় সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও প্রচন্ড দাপটের সাথে বর্তমান বিশ্বকে নিয়ন্ত্রন করে যাচ্ছে। সারা বিশ্বের সব জায়গার বড় বড় মিডিয়াগুলো তাদেরই নিয়ন্ত্রনে।

এরপর রয়েছে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর অবস্থান। যেমন খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়। এদের মিডিয়াগুলো মাঝে মাঝেই মুসলমানদের ব্যাপারে ভয়ঙ্কর ভূমিকা পালণ করে। কখনো কখনো শুধু নিজ নিজ ধর্মপ্রচারে এগুলো কাজ করে থাকে।

আর দুর্বল একটি অংশ আছে যারা নামকাওয়াস্তে মুসলিম। কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে তাদের সামনে সেক্যুলারিজমের মুলো এমনভাবে ঝুলিয়ে রেখেছে, ফলত তারা উপরের দু’টি অংশেরই প্রতিনিধিত্ব করে মাত্র। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা প্রকৃত মুসলমানদের জন্য বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে।

বিশ্বে মুসলমানদের যে অংশটি ব্যক্তিগত জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামকে লালন করেন, ধারণ করেন তাদের হাতে মিডিয়িার কোন নিয়ন্ত্রন নাই বললেই চলে। ফলে তাদেরই আজ বিশ্ব মিডিয়া নানাভাবে হেয়, অপমানিত করে যাচ্ছে।

বর্তমানে মিডিয়া বলতে যা বুঝায় তার কোনটার সাথেই প্রকৃত মুসলমানদের সম্পর্ক নেই। নিয়ন্ত্রন নেই। এ জন্য আমাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা যেমন দায়ী তেমনি মন-মানসিকতাও দায়ী। সাধারণ মুসলিমদের বড় একটি অংশ মিডিয়িার গুরুত্ব অনুধাবন করলেও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসছেন না। অথচ এটা ছিল বড় একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। বিশেষকরে ইসলামে দাওয়াত ও তাবলীগের যে মেহনত চলে সেই কাজে প্রচলিত মিডিয়াকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করা যায়। কিছু প্রশিক্ষিত মানুষকে এ ময়দানের জন্য তৈরী করা হলে অনেক কাজ সহজভাবেই সমাধা করার সুযোগ রয়েছে।

দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে মিডিয়াকে ব্যবহারের সম্ভাবনা অনেক। আমরা যদি আধুনিক প্রযুক্তিকে আমাদের যোগাযোগ, যাতায়াত ও অন্যান্যক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে মিডিয়াকে এই কাজে ব্যবহারে অসুবিধা কোথায়? এখনো মুসলমানদের বড় একটি অংশ মিডিয়ার গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্দি না করায় মূল ধারার নেতৃত্ব থেকে দূরে রয়েছে। এ জন্য শুধুমাত্র ইয়াহুদীর দোষ দিয়ে কী লাভ? আমাদের দোষ কী কম? আমরা নানা ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও মিডিয়ায় খরচ করাকে এখনো অপচয় মনে করি।

এইক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব হলো মুলধারার মুসলমানদের কাছে মিডিয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা। মুসলমানরা কীভাবে মিডিয়া দ্বারা উপকৃত হতে পারে তার রূপরেখা উপস্থাপন করা। মিডিয়ার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করা। আধুনিক মিডিয়া আয়ত্ব করার কৌশল নিয়ে পর্যালোচনা করা। আমাদের অনেকের মধ্যে যে মিডিয়া ভীতি আছে তা দূর করার ব্যবস্থা করা।

মুসলমানদের হাতে অর্থ নেই এ ধারণা এখন মনে হয় ঠিক নয়। যথেষ্ট অর্থ এবং বিত্তবান লোক এখন আছে যারা চাইলে প্রকৃত মুসলমানদের জন্য উন্নত মানের মিডিয়াহাউজ তৈরী করতে পারে। এটা এক ধরণের সঙ্কট। এটা কাটিয়ে উঠার জন্য মুসলমান সম্পদশালীদের নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরী করা যেতে পারে। এর সম্ভাবনার বিষয়টি তুলে ধরা যেতে পারে। মুসলমানদের মূলধারার অংশটির সামনে যদি মিডিয়া মুসলমানদের হাতে না থাকার ভয়াবহ ক্ষতির দিকটা ভালোভাবে তুলে ধরা যায় তাহলে হয়তো আশা করা যায় তারা মুসলমানদের জন্য মিডিয়া গড়তে সহযোগিতার হাত নিয়ে এগিয়ে আসবেন।

মিডিয়া পরিচালনার জন্যও আমাদের প্রস্তুতি প্রয়োজন। মিডিয়া প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের মধ্যে ধারণা রাখেন এমন লোকের সংখ্যা খুবই নগন্য। এ জন্য বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাহিত্য ও সাংবাদিকতা কোর্স চালু করা সময়ের অপরিহার্য দাবী। বর্তমানে যেহেতু স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাশ্চাত্য শিক্ষার একচেটিয়া প্রভাব সেহেতু সেখানে মুসলমানরা পড়ালেখা করে জ্ঞান অর্জন করে আসলেও মূলত তারা বহিঃশক্তির ক্রীড়নক হিসেবেই কাজ করে। এহেন পরিস্থিতি বাংলাদেশের বড় বড় কওমী মাদ্রাসাগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থায় সাহিত্য ও সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করতে পারে। এটা সময়ের অপরিহার্য দাবী। জনবল তৈরী না হলে কোন কাজই সঠিকভাবে আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব নয়। এই ব্যবস্থা আমাদের মধ্যে না থাকায় আমাদের অনেক ছেলে হারিয়ে যায়।নতুন কোর্স চালু হলে আমাদের ছেলেদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিরও সমাধান হয়।

বর্তমানে কিছু মিডিয়া আছে যেগুলো অল্প খরচের ভিতর পরিচালনা করা যায়। যেমন মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করা, অনলাইন মিডিয়া যেমন ওয়েবসাইট পরিচালনা, ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা, সোস্যাল মিডিয়ায় গ্রুপভিত্তিক কাজ করা, অনলাইন রেডিও চালনা ইত্যাদি। এগুলো খুব ব্যয় বহুল নয়। প্রত্যেকটি বড় মাদ্রাসায় একটি করে মাসিক পত্রিকা এবং একটি করে অনলাইন মিডিয়া থাকতে পারে। আর বাছাইকৃত ছাত্রদের হাতে কলমে শিক্ষা দিতে হবে।

লেখক: সৈয়দ শামছুল হুদা অালেম, লেখক ও গবেষক