মুসলমানদের সবকিছুতেই থাকবে স্বাতন্ত্র

265
সৈয়দ শামছুল হুদা

মুসলমানদের নির্দিষ্ট কোন স্থান নেই, নির্দিষ্ট কোন ভুমি নেই, নির্দিষ্ট কোন বর্ণ নেই, গোত্র নেই, ভাষা নেই। সারা বিশ্বের যত বর্ণ আছে, যত ভাষা আছে, যত বিস্তীর্ণ ভূমি আছে সব মুসলমানদের জন্য উম্মুক্ত। আবহাওয়ার সাথে খাপ খাওয়া পোশাক মুসলমানরা পরতে পারে, ভাষার সাথে খাপ খাওয়া শব্দ মুসলমানরা ব্যবহার করতে পারে, বর্ণের সাথে খাপ খাওয়া সংস্কৃতি লালন ও বিকাশ ঘটাতে পারে। তবে কিছু কথা আছে।

সৈয়দ আলী আহসান রহ. এর একটি কলাম পড়েছিলাম। অনেকদিন আগে। তিনি যখন লিখতেন তখনকার সময়ে। সাপ্তাহিক বিক্রমে প্রতি সপ্তাহে তাঁর কলাম থাকতো, সেই সময়ে। তাঁর লেখায় একটি উপমা ছিল মুসলমানদের নিয়ে। তিনি বলেছিলেন- মুসলমানরা হলো বাইম মাছের মতো। সে সব জায়গায় চললেও তার গায়ে কোন কাদা লাগবে না। কথাটা আমার খুব ভালো লেগেছিল।

ইসলাম একটি স্বতন্ত্র বিশ্বাসের নাম। একটি অবিনাশী চেতনার নাম। সেই অবিনাশী চেতনা সব বর্ণ, ভাষা, গোত্রকে তার নিজের মতো করে ফেলে। ইসলাম শিল্প-সংস্কৃতি, আঞ্চলিকতার কোন কিছুরই বিরোধী নয়। ভাষা, বর্ণ, গোত্র সবইতো আল্লাহর দান। তাঁরই সৃষ্টি। আর ইসলাম তাঁরই দেওয়া ধর্ম। তাঁরই দেওয়া জীবন বিধান। তাহলে কেন সংঘাত হবে আঞ্চলিক আদর্শের সাথে? আঞ্চলিক সংস্কৃতির সাথে? ইসলাম বলে সবকিছুকে আল্লাহর রঙ্গে রাঙ্গিয়ে নিতে হবে। বিশ্বের বড় বড় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলগুলোর দিকে আমরা তাকাই তাহলে ব্যাপক বৈচিত্র দেখতে পাই। চীনা সভ্যতা, জাপানী সভ্যতা, ইউরোপিয়ান সভ্যতা, আফ্রিকান সভ্যতা আর এশিয়ান দেশগুলোর সভ্যতা এক নয়।

ইসলাম এ কথা বলে না যে, চীনা মানুষদের সৌদী আরবের সংস্কৃতি গ্রহন করতে হবে, আফ্রিকার কোন দেশকে বলে না যে, তাকে সৌদী আরবের মরুময় আবহাওয়ার সংস্কৃতি সব গ্রহন করতে হবে। তবে, মৌলিক কিছু আদর্শ, কিছু নীতিমালা আছে, যা সারা বিশ্বের সকল মুসলমানের জন্য এক ও অভিন্ন। সেটা করা হয়েছে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। মৌলিক বিধানে কোন পার্থক্য নেই। যেমন তাওহীদবাদি বিশ্বাস, দিনে পাঁচবার সালাত আদায়, মাহে রমযানে সিয়াম সাধনা, হজ্জ ও কোরবানী। এগুলো সব মানুষের জন্য অপরিহার্য বিধান। কিন্তু আপনি কিভাবে ইফতার করবেন, কী দিয়ে ইফতার করবেন, আপনার খাবারের ম্যানু কী হবে সেটা সুনির্দিষ্ট নয়।ঐচ্ছিক। পোশাকের ফরজিয়্যাত বলে দেওয়া হয়েছে, তবে কী কালার পরবেন, কতটুকু পড়বেন, কতটা পড়বেন সেটা ঐচ্ছিক।

অর্থাৎ ইসলামের সৌন্দর্য হলো আমি একজন প্রকৃত বাঙ্গালী হয়েও খাটি মুসলিম হতে পারি, আমি একজন আফ্রিকার অধিবাসী হয়েও খাটি মুসলিম হতে পারি, আমেরিকার নগ্ন সভ্যতার দেশের সাধারণ নাগরিক হয়েও একটি খাটি মুসলিম হতে পারি। কিছু মৌলিক কাজের জন্য, কিছু মৌলিক বিশ্বাসের জন্য। সুনির্দিষ্ট বিশ্বাস, সুনির্দিষ্ট কিছু কাজ একরূপে পালনের মাধ্যমে আমিও হতে পারি খাটি মুসলিম।

আর সেই জন্যই বলি, আমি একজন বাংলাদেশি। আমি একজন বাঙ্গালী হয়েও আমি একজন খাটি মুসলিম হতে পারি। এই দেশ, এই আবহাওয়ার চাহিদা, মেজাজ বুঝে আমি কাজ করবো, আমি কর্মসূচি গ্রহন করবো, আমি আনন্দ-বিনোদন করবো এতে সংঘাত নেই। তবে আমার আনন্দে বিশ্বাসের বিরোধী উপাদান থাকতে পারবে না।

আমার বিজয় দিবস পালন, আমার ভাষা দিবস পালন, আমার নববর্ষ পালন সবক্ষেত্রেই থাকবে স্বাতন্ত্র। আমি এ মাটির সন্তান, আমি এ দেশের সন্তান। এই দেশ, এই মাটির প্রতি আমার আছে ভিন্ন টান। হুব্বুল ওয়াতনে মিনাল ঈমান। আমি এই সবুজ প্রকৃতিকে ভালবাসি। আমি এই নগর সভ্যতাকে ভালোবাসি। আমি বাংলার গ্রামীণ সভ্যতাকে ভালোবাসি। আমি রাজশাহীর আমের উৎসবকে ভালোবাসি। আমি দক্ষিণবঙ্গের ধান উৎসবকে ভালোবাসি। আমি বাংলার মানুষের বোধ-বিশ্বাসকে ভালোবাসি। আমি আমার লোকজ সভ্যতাকে সম্মান করি। এই সকল ভালোবাসার উর্ধে এ কথাও সত্য যে- আমি ভালোবাসি মুহাম্মাদুর রাসুল সা.কে। আমি ভালোবাসি আমার আল্লাহকে।

মুসলমানদের থাকতে হবে সবার সাথে মিশে। সব অঞ্চলের সব সংস্কৃতির পাশাপাশি। শুধু সেই টুকু বর্জন করতে হবে যেটুকু ওয়াহদানিয়্যাতের বিরোধী। মুসলমানরা বিজয় দিবস পালন করবে মুসলমানদের মতো করে। মুসলমানরা নববর্ষ, ভাষা, স্বাধীনতা দিবস পালন করবে মুসলমানদের মতো করে। আমি দেশ ও জাতির চাহিদাকে উপেক্ষা করতে চাই না। আবার বিশ্বাসও বিসর্জন দিতে চাই না। দুইয়ের সমন্বয় করতে হবে। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা মুসলমানদের জন্য প্রয়োজন, শুধু সেই টুকু ছাড়া যেটুকু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যায়। আমরা বলি “মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম”, আমরা লিখি “মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের ভূমিকা”, কেন লিখি? কারণ মুক্তিযুদ্ধ ইসলাম বিরোধী নয়, জুলুম আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা ইসলাম বিরোধী নয়, দুঃশাসন বিরোধী লড়াই করা ইসলাম বিরোধী নয়।

আজ আমি বিজয় উৎসব না করায় কিছু মানুষ মনে করে ইসলাম বুঝি বিজয় বিরোধী, আলেম-উলামারা বুঝি রাষ্ট্র ও সমাজ বিরোধী। আমি কেন এ সুযোগ দেবো? আমি বিজয় বিরোধীও নই, আমি স্বাধীনতা বিরোধীও নই। মুক্তিযুদ্ধে অনেক মা-বোনের রোযা উৎসব পালন, অনেক মুক্তিযোদ্ধার খোদার কাছে বিনীত ক্রন্দন কী ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে? না, কখনোই না। আমাকে সব পরিবেশে, সব সংস্কৃতিক উৎসবে নিজের মতো করে শরীক হতে হবে। আমি ওদের কাছে পরাজিত হতে রাজি নই। ওদের মিথ্যে প্রচারণায় আমি অবাঞ্ছিত হতেও রাজি নই। গণধিকৃত হতেও রাজি নই।
আমি যদি আল্লাহকে স্মরণ করে বিজয়ের গান গাই, তাহলে সেটা দোষের হবে কেন?
আমি যদি মহান রবের স্মরণ দিয়ে নববর্ষকে বরণ করি, তাহলে সেটা ইসলাম বিরোধী হবে কেন?

তবে মুসলিম হিসেবে আমার কাজ ও কর্মের সাথে অন্যান্য সকল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও দল থেকে স্বাতন্ত্র থাকবে। আমার আচরণে ঔদ্ধত্য থাকবে না, অশ্লীলতা থাকবে না, বেহায়াপনা থাকবে না, আমার ভাষায় অহঙ্কার থাকবে না, অকৃতজ্ঞতা থাকবে না। থাকবে বিনয়, থাকবে নম্রতা। এক আল্লাহর বিশ্বাসকে বিজয়ী করাই আমার মিশন-ভিশন। নবী মুহাম্মাদুর রাসূল সা. এর আদর্শকে সুউচ্চে প্রতিষ্ঠিত করাই আমার স্বপ্ন। এই মিশন আর স্বপ্নকে আঞ্চলিক ভাষা দিয়ে. সংস্কৃতি দিয়ে এমনভাবে তুলে ধরবো যেন মহান রবের বড়ত্ব আরো বেশি করে স্মরণ হয়। উচ্চতম আদর্শ হিসেবে মহানবীর শ্রেষ্ঠত্বকে বরণ করে নিতে পারি।

কুরআন ও সুন্নাহকে আমার ভাষা দিয়ে স্বাগত জানাবো। কুরআন ও সুন্নাহকে আমার বর্ণ, গোত্রীয় সংস্কৃতি দিয়ে সাজাবো। এটাই তো আল্লাহর চাওয়া। সৃষ্টির বৈচিত্রের মাঝে খোদার রংকে খুঁজে নেওয়া এটাই তো বান্দার কাছে আল্লাহর পাওনা। গোত্র আল্লাহর সৃষ্টি, ভাষা আল্লাহর সৃষ্টি, বর্ণ আল্লাহর সৃষ্টি, সবাই যদি এক ও অভিন্ন হয়ে যেতো, তাহলে আল্লাহর বড়ত্ব কীভাবে ফুঠে উঠতো? আল্লাহতো চান নানা ভাষায়, নানা ভঙ্গিতে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করুক। এটাকে আমি কেন বারণ করবো?

হে মহান বিধাতা, এ বাংলা ভাষায় তোমাকে জানাই আমার প্রাণের শক্তির সবটুকু দিয়ে শ্রদ্ধা, সম্মান আর ভালোবাসা। সকল প্রশংসা শুধু তোমারই জন্য। হে রাসুল, আপনার খুশিই আমার একান্ত চাওয়া। আপনার ভালোবাসা অর্জনই আমার পরম আরাধনা। নানা ভাষায় আপনার প্রতি দরুদ ও সালাম।

লেখক: সৈয়দ শামছুল হুদা, অালেম লেখক ও গবেষক