জনশক্তির অথর্বতাঃ প্রয়োজন নবপ্রজন্মের ইশতিহার ও একটি ইনকিলাবের

260

সম্পন্ন হল জেলা-ইজতেমা। ময়মনসিংহস্থ আকুয়া বাইপাস সংলগ্ন মারকাজ মসজিদ-আঙিনা ও অল্প দূরত্বের বিশাল মাঠে নেমেছিল লাখও জনতার ঢল। যানের আকার বড়, তাই জ্যামের পরিচিতি ব্যাপক হলেও তা স্বাভাবিক। কিন্তু আকারে ক্ষুদ্র দলীয়দের মেলা যখন জ্যামের সৃষ্টি করে, নিঃন্দেহে তা স্বাভাবিকতার উর্ধ্বে, কমকরে বিস্ময়কর। বোধ হয়, অসাধারণ সেই কারক বিষয়টির শিকড়ের গভীরতা ও তার জোর, পাশাপাশি কারকের উপর সেসমস্ত লোকের মনের ভক্তি-আস্থার প্রমাণ ও পরিমাণও ফুটে ওঠে। ইজতেমাগুলো আমাদেরকে সেই তত্বের দিকেই ইঙ্গিত করে।
বাংলাদেশের মানুষ মূলত ইসলামমনা। সুফি-দরবেশের নিঃশ্বাস মিশে থাকা এ প্রকৃতি বাতাসে ছড়িয়ে রেখেছে যেন আজও আল্লাহ-আল্লাহ জিকিরের প্রতিধ্বনি, বাস্তবজীবনে পরিলক্ষিত হয় যার প্রভাব। সেই ধ্বনিকারকদের তান আজও দূরে থাকা মাতৃস্নেহের পরশের স্বাদ ও মৌনতৃপ্তি জাগায়। পতন, আত্মবিস্মৃতি, অযাচিত সংস্কার-মানসিকতা এবং ইসলাম-বিদ্বেষের এ যুগেও তাই ইসলামের নামে ডাকা আয়োজনগুলোর প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করা মানুষের সংখ্যা এখনও গরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেনি।

ইজতেমাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ইসলামের জন্য আত্মত্যাগের মানসিকতা আজও বিলিন হয়ে যায়নি মুসলিম কিশোর-যুবক-বৃদ্ধদের অন্তর থেকে, যদিও তা আজ জং ধরা। শেষ সময়ের ডাক যেমন অলসকেও ঝাঁকিয়ে দেয় কিছুটা, তেমনই ইসলাম নাম্নীর ডাকেও ভালোবাসার উত্তেজনারা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আজও বাংলার মুসলিম-মানসে। ইজতেমায় মানুষ যোগ দিয়েছেন স্বতস্ফুর্ত হয়ে, আপন জীবন ও সম্পদের অল্পত্যাগ সহকারে। এই ইমানোদ্দীপক অনুষ্ঠানটির জন্য মানুষের মনে অসাধারণ ভক্তি-শ্রদ্ধা জন্ম নিয়েছে। বলতে হয়, এটি ইলিয়াস (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মনের ইখলাসপূর্ণ দরদি আগুন, যেটাকে আল্লাহ তায়ালা লাভার আকারে ছড়িয়ে দিয়েছেন সারাবিশ্ব জুড়ে। মানুষের মনের ইমানি অগ্নিস্ফুলিঙ্গের অস্তিত্ব পরখ করতে তাবলিগ আজ একটি উত্তম মাধ্যম। পাপের সমুদ্রে ডুবা মানুষটিও এর প্রতি যে বিনয়-ভক্তি প্রকাশ করেন, তার টিমটিম আলোর ইমানি বিশ্বাসের বাতিটা তখন ভেসে ওঠে বিজ্ঞজনের অন্তর্দৃষ্টিতে। তিন দিন থেকে শুরু করে চল্লিশ দিন, এ থেকে আরও বেশিদিন সময় দিয়ে এ মহৎ পথে নিজের ইমানি নুরটুকুর বৃদ্ধি সম্পন্ন করি আমরা আজ।

সুতরাং এ বিষয়টি প্রমাণিত, কমকরে বিশ্বাস-প্রাবল্য এ দিকেই যে, বাংলার মানুষ মনে ছাইচাঁপা ইমান লালন করেন এবং তার প্রতি ভালোবাসাও রাখেন। কর্ম সম্পাদকের কার্যক্রম এবং মুখনিসৃত মনের অভিব্যক্তি তার মধ্যে লুকায়িত ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায়। তো
তাবলিগ ও ইজতিমার প্রত্যক্ষ ঘোষণা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার জন্য ত্যাগ এবং ভালোবাসায় উজ্জীবিত হওয়ার আহ্বান। আর যে ভালোবাসে, সে সাধারণত প্রিয়’র সবটুকুকেই ভালোবাসে, -কমকরে ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা রাখে-। সুতরাং এ তাবলিগ-ইজতিমায় শরিক হওয়া এ মানুষগুলো মূলত আল্লাহকেই ভালোবাসেন। গোটা কুরআন-সুন্নাতকেই তারা আঁকড়িয়ে ধরার ক্ষমতা রাখেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্নজনের জীবনবদলের গল্প শুনে।

কিন্তু ইসলামের প্রতি সুপ্ত ভালোবাসুক মনোভাবের এ বিপুল সংখ্যক জনতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও প্রতিপত্তির ক্ষেত্রে ইসলামি অঙ্গনগুলো প্রতিবন্ধি। এর কারণ পরিপূর্ণ পরিচর্যার অভাব। কেননা মানুষের মনের ইমানি চেতনা রয়েছে –হোক তা অল্প-, যা ইজতিমাগুলর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কিন্তু অন্য অঙ্গনের কর্মীগণ মানুষের মধ্যে তাদের অঙ্গনের প্রতি সেই চেতনা তৈরী করতে পারছেন না। তাই, অল্প ইমানি এই মুসলিমদের ব্যাপকভাবে তাবলিগকে গ্রহণ করার পেছনের তত্ত্বটি নিয়ে ভাবা অতি জরুরি। কেননা ভালোবাসার উৎস ও উদ্দেশ্য যখন এক, কিন্তু ক্ষেত্রভেদে ফলাফল ভিন্ন, সুতরাং কোনও সমস্যা ও পার্থক্য নিশ্চয় রয়েছে উভয়ের মাঝে, যা ফলাফলের একত্বে বাঁধা প্রদান করছে।

এক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে একটি কারণ প্রতীয়মান হয় যে, তাবলিগের কর্মীগণ সঠিকভাবে তাদের উদ্দেশ্য সাধনে চেষ্টা-আত্মত্যাগ এবং পরিচর্যার ক্ষেত্রে যত্নবান ও নিয়মিত। তাদের যে মূলনীতি এবং পথনির্দেশ রয়েছে, তাতে তারা সচেষ্ট এবং আন্তরিক। পক্ষান্তরে অন্য অঙ্গনগুলোর কর্মীগণ অবশ্যই তাদের কর্তব্যে শিথিল এবং উদাসীনতা-অবহেলায় লিপ্ত। তাবলিগের জন্য মুসলমানগণ যেখানে স্বতস্ফুর্ত এবং ভক্তিমূলক আচরণে আত্মমগ্ন, সেখানে মাদরাসা-মসজিদ, ইলমচর্চা, তাযকিয়া, ইসলামের সঠিক ধারার রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে তারা বহুলাংশে পিছিয়ে। বরং বলা যায়, ইসলামের কিছু ক্ষেত্রের প্রতি মানুষমনে রীতিমত অনিহা-অবহেলা এবং বিদ্বেষভাব জন্মিয়ে রয়েছে।

অবশ্য তাবলিগের সাথে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রকে তুলনা করায় একটি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আর সেটিই মূলত তাবলিগের ব্যাপক প্রসারতার পেছনে পরোক্ষ কারণ। বরং অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে তা। সেটি হচ্ছে, তাবলিগ ‘বিরোধিতা না করা এবং প্রতিকূলতা এড়িয়ে চলা’-এর নীতিতে বিশ্বাসী। পক্ষান্তরে ইসলামের অন্যান্য সকল অঙ্গনেই মানবমনের কলুষতাপূর্ণ স্বার্থের প্রতি আঘাত রয়েছে। কেননা ফিকহি বিধান ব্যাংকের প্রতি ঘৃণা মনোভাব পোষণকারী এবং অভিসম্পাতকারী। তাযকিয়া লোভের প্রতি অনিহাভাব প্রকাশকারী। সঠিক ধারার রাজনীতি সমস্ত মতবাদের প্রতি খোলা তরবারি। আর এসমস্ত আঘাত মূলত কালিমা তইয়িবা থেকেই নিসৃত, তাই এগুলোকে গোঁড়ামি আখ্যা দেয়ারও কোনও সুযোগ ও যৌক্তিকতা নেই। কেননা তাওহিদের কালিমা দু’টো ভিতের উপর দাঁড়িয়ে, একঃ সৃষ্টের শক্তি ও আনুগত্যকে অস্বীকার, দুইঃ প্রভুত্ব ও আনুগত্যে একত্বের স্বীকার। এগুলোর ক্ষেত্রে তাবলিগে পরোক্ষ বিচরণ পাওয়া যায় কেবল। যেজন্য মানবমনের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাবলিগ অনেকটা নিরাপদ। হ্যাঁয়, সময়ের সাথে অবশ্য তাদের মধ্যেও পূর্ণ ইসলামি চেতনার উন্মেষ ঘটতে থাকে। কিন্তু মৌলিকভাবে প্রভাব বিস্তারমূলক বাঁধাদানে তাবলিগের কোনও ভূমিকা নেই -রাজনৈতিক দোষ-ত্রুটি তুলে ধরা যাবে না, এটি মূলনীতির আসনে প্রতিষ্ঠিত-। বরং প্রাথমিক কৌশল হিসাবে তাতে মিশতে পারার সুযোগকে প্রাধাণ্য দেয়া হয়েছে।

সুতরাং তাবলিগি অঙ্গনটির সঙ্গে অন্য অঙ্গনগুলোর পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে। আর তা হচ্ছে স্বার্থের সংঘাতে সক্রিয়তা ও নীরবতার। কিন্তু শাঁক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা এক্ষেত্রে বৃথা। কেননা সঠিক ও যত্নবান চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইসলামের সমস্ত কড়াগুলোই মুমিনমনে গেঁথে দেয়া সম্ভব। প্রয়োজন কেবল সুষ্ঠভাবে এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে কর্মসম্পাদন। মক্কি জীবনে রাসুলুল্লাহ (আলাইহিস সালাম) ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। এক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিপত্তির অভাবে প্রভাবের অনুপস্থিতির পাশাপাশি অন্য একটি কারণ হচ্ছে, মক্কাবাসীর মুসলিম না হওয়া। এটি কারণ হওয়ার প্রমাণ দেখুন, যারা মুসলিম ছিল, তারা তাগুতের সঙ্গে আপোষ করতেন না। বিলাল, উমরসহ অন্যান্য সাহাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) কেউই প্রতিকূল অবস্থায় মূর্তিপূজায় লিপ্ত হননি। সুতরাং আমাদের কথায় স্বার্থের আঘাত রয়েছে, বিধায় বাংলাদেশ -বরং পুরো বিশ্বের- মুসলিমগণ পরিপূর্ণ ইমানের পথে আসছে না, তা পূর্ণ বাস্তববাদী কথা হবে না। কেননা এরা যেহেতু মুমিন, তো বিশ্বাসের মিষ্টতা ও স্নিগ্ধতা এদের অধরা নয়। সুতরাং, প্রয়োজন মূলত কেবল জাগ্রতকরণের। তখন এদেরকেও বিলাল ও সুমাইয়ার (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) ইমানি চেতনায় পাওয়া সম্ভব –ইন’শা’আল্লাহ-। আল্লাহর জন্য জীবনকে এরাও তুচ্ছজ্ঞান করতে সক্ষম হবে।

এ অবস্থায় -বিশেষ করে- আলেমদের জন্য দায়িত্বভার এখন ব্যাপক বোঝাকারে প্রকাশ পেয়েছে। কেননা পূর্বের অনাদায়ী দায়ও এসে ঘাড়ে চেপেছে নতুন প্রজন্মের। এর উপর রয়েছে বস্তুবাদের নতুনসব মানসিকতা ও চেতনার স্তুপ। তাই, আমাদেরকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবতে হবে একসঙ্গে। আমরা ইচ্ছা করব এবং পা ফেলব, গন্তব্যে পৌঁছাবেন আল্লাহ, এ বিশ্বাসে প্রত্যেকটি আলেমেরই নিজের সঠিক ক্ষেত্র নির্বাচন করে নিতে হবে -আর তা এখনই- এবং কাজে নিমগ্ন হতে হবে। ভালো এবং বিচক্ষণ বড়দের অধীনে নিজেদেরকে সক্রিয় করতে পারলে সে সময়টি দূরে নয় –ইন’শা’আল্লাহ-, যেদিন তাবুকের তিন অনুতপ্তের হৃদয় আমাদের মধ্যেও জাগ্রত হবে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে, নেতৃত্ব নির্বাচনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া। আল্লাহর দেয়া উপলব্ধিকে কাজে না লাগানোর দায়ে ‘বেড়া ক্ষেত খেয়ে ফেলেছে’-এর উদাহরণ শুনায় আমরা আজ অতিষ্ঠ। চারদিকে কেবল কোন্দল আর প্রান্তিকতা। তাই হাদিসে আলোচিত ‘মুর্খ নেতামূলক ভাষ্য’-এর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে আমাদেরকে নিজেদের কর্মপন্থা ঠিক করে নিতে হবে।

আলোচনায় একটি বিষয়ের উপস্থাপন অপ্রাসঙ্গিক হবে না আশা করি। মারকাজুদ দাওয়ায় অধ্যয়নরত প্রিয় বড় ভাই তকি পূর্বে এক ইজতেমার দৃশ্য বর্ণনা করে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছিলেন এভাবে, ‘এতো বিপুল জনসমাগম, অথচ এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত নেই। এই অথর্ব জনশক্তি…’।

ভাইয়ার কথায় আমি পূর্ণ একমত। তবে এক্ষেত্রে আমি একটু ব্যাখ্যায় যাব যে, এখানে তাবলিগের উপর পূর্ণ ভার ছেড়ে দিয়ে পরিপূর্ণ ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সফল না হওয়ায় তাকে দোষারোপ করার কোন প্রয়োজন নেই। একটি প্লাটফর্ম থেকে সমস্ত কর্তব্য দায়িত্ব হিসেবে পালন করতে হবে, সেরকম কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সময় এসে দাঁড়ায় তখন, যখন অন্য দীনি বিষয়গুলোকে অস্বীকার, বা অবহেলাজনক ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করা হয়।

আলোচনার কর্মপন্থা স্থিরে দু’টি বিষয়ে ভাবার প্রস্তাবনা করা যেতে পারে।
এক, সংস্কার। আলেমদের তাবলিগের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাকে সংস্কাররূপ দান করা। যেন তা সীমাবদ্ধতা ছেড়ে সকলের নিকট পূর্ণ ইসলামের মুখপাত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়।
দুই, আবিষ্কার। নতুন কোনও প্লাটফর্ম তৈরী করে অন্যান্য বিষয়ের সঠিক ধারাগুলো প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা।
অবশ্য সংস্কার ও আবিষ্কার, এ দু’টোর ক্ষেত্রে তাত্বিক ভাবনা প্রয়োজন যে, কোনটি অধিক ফলপ্রসূ হবে। আবার আপেক্ষিকতার বিষয়টিকেও বিবেচনায় রাখতে হবে উভয়টির ক্ষেত্রে। কিন্তু মূলকথা হচ্ছে আমাদেরকে লোকমনের ছাইচাঁপা ইমানি আগুনটিকে জ্বালিয়ে তুলতে হবে। ওরা ইমানদার, ওরা ইমানকে ভালোবাসে, ওরা ইমানের জন্য আত্মত্যাগ ও বিলিন হতেও রাজি হবে, কিন্তু সঠিক পরিচর্যার অভাবী অঙ্গনগুলোতে তারা আজ অচেতন সিংহ।

আল্লাহ সঠিক পথে উত্তররূপে চলা তওফিক দান করুন, আমিন।

লেখক: সদরুল আমিন সাকিব, আলেম, লেখক ও গবেষক