মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক থাকতে হবে

411
ইনকিলাব

মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আরো বেশি সতর্ক থাকার আহবান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি ও দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক আলহাজ্ব এ এম এম বাহাউদ্দীন। 
তিনি বলেন, সরকারের অতীতের সব ভাল কাজের সঙ্গে আমরা ছিলাম, আছি থাকবো। প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে যারা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন তাদের বিষয়ে তিনি যত বেশি সতর্ক থাকবেন সেটা ওনার এবং আমাদের জন্য ভাল হবে।’ 

মঙ্গলবার সকাল ১১ টার দিকে নগরীর মোমেনশাহী ডিএস কামিল মাদরাসা চত্বরে ময়মনসিংহ বিভাগীয় জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। 
৩ দফা মেয়াদ বৃদ্ধি করা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) বহুল আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত ডিজি’র বেফাঁস, লাগামহীন কথাবার্তা এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে জমিয়াতের সভাপতি বলেন, ইফা’র ডিজি মাদ্রাসা শিক্ষার অপ্রয়োজনীয়তার কথা অসংখ্যবার টিভিতে আলোচনায় বলেছেন। সেই ডিজির চাকরি ৩ বার এক্সটেনশন হয়েছে। এ ডিসেম্বরে তার এক্সটেনশন শেষ। এই শেষ মাসে এসে তিনি লম্ফঝম্ফ করছেন। উনি আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষার বই ঠিক করবেন বলেছেন, আমরা সেটি মানবো না। এ নিয়ে সরকার ঘোষণা দিতে পারবে, কারণ সরকারের ক্ষমতা আছে। কিন্তু এর ফলে সরকারের সঙ্গে একটি অপ্রয়োজনীয় বিরোধ সৃষ্টি হবে। আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি সচেতনভাবে দেখবেন।’

প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রী, মাদ্রাসা বোর্ড, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা বান্ধব সব জায়গায় আমরা সহযোগিতা করছি। আমার কথা হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় বিরোধটা ডেকে আনবেন না। আপনার সব ভাল কাজের সঙ্গে আমরা আছি। কোন কিছুর প্রয়োজন হয়, কোন সংগঠনের দরকার হয় আমরা আপনাকে সহযোগিতা করবো।’ 
মাদরাসা শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকুরী জাতীয়করণ, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ বিষয়ে এ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ জেলা জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ড. মো. ইদ্রিস খান। 
দ্বীনে পেশাজীবীদের এ সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসচিব প্রিন্সিপাল মাওলানা শাব্বির আহমদ মোমতাজী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপ-পরিচালক এ.এস.এম.আব্দুল খালেক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম। 

বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন শুধুমাত্র মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির জন্য একটি সংগঠন নয়, এদেশের মূলধারার একটি সংগঠন উল্লেখ করে জমিয়াতের সভাপতি ও ইনকিলাব সম্পাদক আলহাজ্ব এ.এম.এম.বাহাউদ্দীন বলেন, দেড় কোটি ভোট জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের পতাকাতলে রয়েছে। আপনাদের ভয় পাওয়ার দরকার নেই। মানুষের মন, মতামত ও সচেতন করতে পারে এরকম মানুষ জমিয়াতের সঙ্গে ইউনাইটেড আছে। প্রধানমন্ত্রী গত নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে আমাদের গণভবনে ঢেকে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় চূড়ান্ত করার ঘোষণা দিলেন। তারপর কার্যক্রম শুরু হলো। আমাদের মাদ্রাসার সঙ্গে জড়িত সকল স্তরের এমপিওভুক্ত, ননএমপিওভুক্ত শিক্ষক, কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণের ঘোষণা দিবেন। সরকারের অতীতের সব ভাল কাজের সঙ্গে আমরা ছিলাম, আছি থাকবো। 
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন ৬০’র পর বার্ধক্য ধরা হয়। এটা ৬৫ করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন। এটার সঙ্গে শিক্ষকদের চাকরির বয়সসীমা বাড়াতে আরো একধাপ এগিয়ে গেলাম। প্রবীণ শিক্ষকদের সেবার কোন বিকল্প নেই বলেও মত দেন তিনি।

জমিয়াতুল মোদার্রেছীন বাংলাদেশের আলেমদের সংগঠন উল্লেখ করে ইনকিলাব সম্পাদক বলেন, যারা চলে গেছেন, আছেন এবং যারা অধ্যয়নরত আছেন সকলে এ সংগঠনের মালিক এবং সদস্য। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শিক্ষিত লোকের সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন। ৮০ লক্ষাধিক ছাত্র-ছাত্রী, ২০ হাজারের ওপর প্রতিষ্ঠান, ৩ লক্ষাধিক শিক্ষক নিয়ে এতো বিশাল একটি সংগঠন। আর এটি প্রতিষ্ঠা আলেমরা করেছেন। সকল খানকায়ে দরবার থেকে শুরু করে আলেম-ওলামারা সকলে এটির সঙ্গে আছেন। এবং এটির’ নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে আছে এবং তাদের হাতেই থাকবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একজন মাদ্রাসা শিক্ষককে সবাই সম্মান করেন। লেবাস এবং নিজের এলেমকে গুরুত্ব দিতে হবে। 
মাদ্রাসা শিক্ষার আগ্রহ এবং গুরুত্ব প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে এদেশের যারা শিক্ষা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন তারা ওয়াকিবহাল এমনটিও বলেন দেশের মাদ্রাসা শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একক সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি আলহাজ্ব এ.এম.এম.বাহাউদ্দীন। 
আজ বুধবার থেকে ঢাকায় শুরু হওয়া ডিজিটাল এক্সপো’র উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সৌদি আরব থেকে একটি রোবট এসেছে তার নাম সুফিয়া। এ রোবটকে সৌদির নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে। ঢাকায় আসার সময় তার ইমিগ্রেশন, কাস্টমস মানুষের যা যা করা দরকার সবকিছুই করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ৮০ কোটি মানুষের চাকরি খেয়ে ফেলবে এসব রোবটরা। 

ইনকিলাব সম্পাদক আরো বলেন, ইতোমধ্যে শিক্ষকবিহীন ক্লাস রুম যুক্তরাজ্য,যুক্তরাষ্ট্র, ল্যাটিন আমেরিকা এবং চীন ভারতেও পরীক্ষামূলক শুরু হয়েছে। মানুষের স্থান যন্ত্র নিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষকরা সেরা। কোরআন, হাদিস, ফিকাহ ভিন্ন নলেজ। এটি আমেরিকা, ইউরোপ তৈরি করতে পারবে না। 
বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন বিশ্বব্যাপী মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থার রোল মডেল, উল্লেখ করে দেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখদের ঐক্যের প্রতীক এ.এম.এম.বাহাউদ্দীন বলেন, সৌদি আরবে সবকিছু পাল্টে যাচ্ছে। আফ্রিকায় সৌদি আরব ১ মাসে ৫’শ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে তাদের ভাষায় উগ্রবাদ ও সালাফী জঙ্গিদের দমন করার জন্য। এদের পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছিল। আফ্রিকা মহাদেশের শাসন ব্যবস্থা পাল্টানো, ধর্মীয় চিন্তাটা পাল্টানো, রাজনীতিটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। সৌদি আরবে অন্তত তাদের ভাষায় ১০ হাজার উগ্রবাদীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। কাউকে ৫ স্টার জেলে রেখেছে কাউকে ফাঁসি দিয়েছে। 

ইনকিলাব সম্পাদক দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ফেতনা-ফ্যাসাদের ইসলাম এদেশে চলে নাই, চলবে না। যারা তাদের পয়সায় এখানে অন্য ধারার ইসলাম কায়েম করার চেষ্টা করেছিল তারা খবর দ্রুত পেয়ে যাবেন। তাদের পয়সা বন্ধ হয়ে যাবে। জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের যে ধারা সৃষ্টি হয়েছে, মাদ্রাসা শিক্ষা যে ধারায় চলছে বিশ্বব্যাপী এটি মডেল হবে, বাংলাদেশেও হবে। মানুষকে সচেতন করা পুলিশ, বন্দুক দিয়ে হবে না। এটার জন্য প্রয়োজন সচেতন, ঈমানদার, সৎ নাগরিক। আর সেটা দিতে পারে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষকরা। সরকারের বুলেট, অস্ত্র, গোলাবারুদ আর অন্যান্য কাজে মানুষ নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি বাদ দিয়ে শিক্ষকের পেছনে সরকার যত বেশি ব্যয় করবেন আমরা বলতে পারি মাদ্রাসা শিক্ষকরা জাতিকে তার চেয়ে বেশি দিতে পারবেন। 
মাদ্রাসা শিক্ষা মূল্যবোধ, নীতি নৈতিকতার শিক্ষা দেয় এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবার নিয়মে সঙ্কট দেখা দিয়েছে। নারীদের মধ্যে চরিত্রগত সঙ্কট দেখা দিয়েছে। গার্মেন্টেসের মেয়েদের বিয়ে শাদি হয় না। অথচ অর্থনীতিতে তারা বিশাল অবদান রাখছে। কিন্তু মাদ্রাসার ৩৫ লাখ ছাত্রী পড়াশুনা করছে। তাদের শতভাগের বিয়ে হচ্ছে। তারা ঘর সংসার করে দিচ্ছে। বিনা পয়সায় আলেমরা সমাজ রাষ্ট্রের কাজ করে দিচ্ছে। হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজে আসবে না যদি প্রপার সোলজার তৈরি না হয়। 
ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলনের শুরুতে ঐতিহ্যবাহী কাতলাসেন কাদেরিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল ওয়াহাব মাদানী জমিয়াতের সভাপতি ও ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীনকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। পরে জেলা জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি ড.ইদ্রিস খান তার হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন। এ সময় মুহুর্মুহু করতালিতে তাকে স্বাগত জানানো হয়। 

এ সম্মেলনে ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও জামালপুর জেলার জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের নেতৃবৃন্দ ও ৪ জেলার বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীরা যোগ দেন। দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনকে ঘিরে তাদের মাঝে ছিল ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা। 
সম্মেলনে প্রধান বক্তার বক্তৃতায় বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসচিব প্রিন্সিপাল মাওলানা শাব্বির আহমদ মোমতাজী বলেন, যে যত কথা বলেন, ষড়যন্ত্র করেন জমিয়াতের ঐক্য বিনষ্ট করা যাবে না। জমিয়াতুল মোদার্রেছীন এদেশের আলেম-ওলামাদের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন। অতীতে যারা বেঈমানি, বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তারা শেষ হয়ে গেছে। মাদ্রাসা শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে কাজ করছে। 
তিনি বলেন, স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এজন্য একটি কমিটি করেছে এ বাজেটে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কীভাবে এবতেদায়ী মাদ্রাসা হবে, শিক্ষকদের যোগ্যতা কী হবে এসব নিয়ে কমিটি হচ্ছে। 
বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপ-পরিচালক এ.এস.এম.আব্দুল খালেক বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষকদের বড় অর্জন মাদ্রাসা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় পেয়েছেন। কারণ তারা ঐক্যবদ্ধ। নেতারা ডাকলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। 

ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষকরা হচ্ছেন ডাবল শিক্ষক। কারণ মাদ্রাসা শিক্ষকরা সাধারণ ও এলেম দুই লাইনেই উত্তর দিতে পারেন। এ কারণে তাদের ডাবল সম্মান পাওয়ার কথা। মাদ্রাসা শিক্ষকরা সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে কাজ করছেন।-ইনকিলাব