ইসলাম চির উন্নত কখনো করে না মাথানত

361
আনাস বিন ইউসুফ

কিছুদিন আগে দেখলাম, আমাদের কিছু ভাই পোপ ফ্রান্সিসের আগমনকে কেন্দ্র করে “দেশের ওলামায়ে কেরাম কেন প্রতিবাদ করছেন না, বা তার আগমন ঠেকানোর ঘোষণা দিচ্ছেন না” এজাতীয় নানান আপত্তি তুলেছেন ৷ এবস আপত্তি আমার কাছে নিতান্ত হাস্যকর মনে হয়েছে ৷

তাদের আপত্তির মূল জায়গাটি ছিল, অতীতে কোন এক সময় ডা. জাকির নায়েককে বাংলাদেশ সফর করানোর একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ৷ উদ্যোগটি নিয়েছিল, ডাক্তার সাহেবের এ দেশীয় অনুসারীবৃন্দ ৷
সে সময় দেশের উলামায়ে কেরাম ডাক্তার সাহেবের আগমন প্রতিরোধের ঘোষণা দেন ৷ তাকে যেন আসতে দেয়া না হয় সেজন্য সরকার ও প্রশাসনের কাছে জোড়ালো আবেদন জানান ৷ এবং শেষ পর্যন্ত তার আসার সুযোগ হয় নি ৷
.
তখন একজন দেশ কাঁপানো (বাজেট) বক্তা (অনেকে বলে, হেলিকপ্টার হুজুর) কোন এক মাহফিলে (জোশের ঠেলায়) বলে ফেলেছিলেন, জাকির নায়েককে বাংলার জমিনে পা রাখতে দেয়া হবে না, হবে না, হবে না….! (জনগণ বলে, ঠিইইইককক)
.
তো ঐ ভাইদের আপত্তি হল, ডাক্তার জাকির নায়েক একজন মুসলমান ৷ ধর্মের বিষয়ে জ্ঞানের সাগর সাথে নিয়ে চড়েন ৷ আর পোপ হচ্ছেন ক্যাথলিক খৃস্টানদের ধর্মগুরু ৷ জাকির নায়েকের ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন পোপের বেলা কেন নয়? পোপের বাংলাদেশ আগমন কেন ঠেকানো হচ্ছে না? জাকির নায়েক আসতে না পারলে পোপ কেন পারবে?
.
তারা এজাতীয় প্রশ্নে তুলে রীতিমত ঝড় উঠানোর চেষ্টা করেছেন ৷ তখন চোখে পড়ার পর তাদের আপত্তির জবাবে কী-বোর্ডে আঙ্গুল রেখেছিলাম ৷ সিরাতের কিতাবে নজর দিতে চেষ্টা করেছি, অন্য ধর্মের ধর্মগুরু অথবা সাধারণ লোকদের সাথে রাসূল সাঃ কেমন আচরণ করতেন, সিরাতে-নববী থেকে আমাদের জন্য উল্লেখিত প্রেক্ষাপটে কোন শিক্ষা আছে কিনা, জানার চেষ্টা করেছি ৷ অথবা ইসলাম পোপের আগমনকে কিভাবে মূল্যায়ন করবে এ বিষয়টা নিয়েও ভাবতে চেয়েছি ৷
.
পরবর্তীতে কেন জানি, নিরুৎসাহিত বোধ করি ৷
ফলে আর কিছু লেখা হয় নি ৷
.
শিরোনাম প্রসঙ্গে যাবার আগে “পোপ নাকি জাকির নায়েক” বিষয়ে দুটি কথা বলি ৷

ক. জাকির নায়েকের বিষয়টি কখনোই পোপের সাথে তুলনা করার মত নয় ৷ দেশের বিজ্ঞ আলেমগন বর্তমান সময়ে যেসকল ফেতনা মোকাবেলা করছেন এবং তা থেকে উম্মতকে বাঁচানোর পথ খুঁজছেন তার মধ্যে অন্যতম একটি ফেতনা হচ্ছে “লা-মাযহাবী ফেতনা” ৷

হ্যাঁ, লা-মাযহাবী ভাইয়েরা কোন ভ্রান্ত ফেরকার নয় ৷ তারা এবং তাদের তৎপরতা এই সময়ের একটি বিপদজনক ফেতনা তথা সমস্যা ৷ অথবা এক ধরনের সংকটও বলা যায় ৷ তাদের দাবি ও বক্তব্য অনুযায়ী উম্মতের দীর্ঘ দিনের আমল বাতিল ও ভুল প্রমাণিত হওয়া আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায় ৷
(লা-মাযহাব বিষয়ে বিস্তর আলোচনার জায়গা এটা না ৷ তাই দুই লাইন বলেই ক্ষান্ত থাকলাম!)

লা-মাযহাবী বা সালাফী ফেতনা মোকাবেলার অংশ হিসেবেই তখন দেশের উলামায়ে কেরামগন ডা. জাকির নায়েকের বাংলাদেশ আগমনের বিরোধিতা করেছিলেন ৷ কেননা, তাঁর সফরের মধ্য দিয়ে তার অনুসারীবৃন্দ ফেতনা সৃষ্টিতে আরো আস্কারা পেতো ৷ তাদের চলমান তৎপরতা আরো গতিশীল হয়ে উঠতো ৷
(এখনো যে থেমে আছে তা নয়) ৷

উলামায়ে কেরাম চেয়েছেন, বিভ্রান্তকারীরা যাতে আরো চাঙ্গা হতে না পারে ৷ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে ৷ সে লক্ষ্যেই জাকির নায়েকের বাংলাদেশ সফর ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন ৷

খ. পোপকে আমরা কিভাবে বরণ করবো?

আলোচনার ডানে-বামে না গিয়ে ক্ষুদ্র জ্ঞানের আলোকে কিছু মৌলিক কথা বলি ৷

আজ যদি ইসলামি শাসন ব্যবস্থা জারি থাকতো, দেশ পরিচালনার যাবতীয় দায় দায়িত্ব প্রকৃত অর্থে যদি মুসলমানদের হাতে থাকতো তাহলে পোপের কাছে এমন লজ্জাজনক আত্মসমর্পনের দৃষ্টান্ত দেখতে হতো না আমাদের ৷ আমরা মুসলিম জাতি ৷ বীরের জাতি ৷ ইসলাম আমাদের ধর্ম এবং গর্ব ৷ পৃথিবীতে শান্তির বার্তা নিয়ে আগমন করেছিলেন ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৷
.
পোপ কি করে শান্তির দূত হতে পারে? পোপদের অত্যাচারের ইতিহাস কি ভুলে গেছে পৃথিবীবাসী?
এখনো কি পোপ ও তার অনুসারীদের লীলাখেলা দেখা যায় না? যে পোপ অত্যাচারির আবেদনে মাজলুম জনগোষ্ঠির নামটিও মুখে নিতে পারেন নি তিনি কি করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন? বিশেষত মুসলমানদের জন্য?

তাহলে কেন আজ মুসলমানরা অন্য ধর্মের একজন গুরুকে স্বাগত জানাবে নিজেদের মাথা নুইয়ে? উষ্ণ অভ্যর্থনা দিবে? লালা গালিচা সংবর্ধনায় উল্লাসের মত কাজ করবে? মুসলমানদের অর্থ ব্যয় করে গার্ড অব অনার দেয়া হবে? সর্বপরি তার কাছ থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা করবে? মাথা উঁচু করা বীরের জাতির জন্য কি এসব লজ্জাজনক নয়?

আমাদের স্মরণ থাকা উচিত পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত- و كلمة الله هي العليا
[অর্থ- আর আল্লাহর কালিমাই সদা প্রতিষ্ঠিত]

রাসূল সাঃ বলেন, الإسلام يعلو ولا يعلى
[ইসলাম চির উন্নত কখনো করে না মাথনত]
.

※ ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পোপ ফ্রান্সিসকে যেভাবে স্বাগত জানানো হতো তার একটা সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরা যেতে পারে;

১. সর্ব প্রথম তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ৷

২. তার ধর্মের লোকজন যাতে তাকে সম্মান জানাতে পারে, তার সাথে দেখা করতে পারে সে ব্যবস্থা করা ৷

৩. “ইসলাম ধর্ম সকল ধর্মের স্বাধীনতা দিয়েছে ৷ ধর্ম গ্রহনে কোন প্রকার জোরজবরদস্তি ইসলামে নেই ৷ অন্য ধর্মের মানুষকেও ইসলাম নিরাপত্তা দেয়” এই বিষয়টি পোপকে বুঝিয়ে দেয়া ৷

এর বাইরে মুসলমানদের দেশে এসে পোপকে অবশ্যই মাথা নিচু করে থাকতে হবে ৷ কারণ ইসলামই চির উন্নত, অন্যরা ইসলামের কাছে করবে মাথানত ৷

নিজের কাজ সেরে (তার অনুসারীদের সাথে দেখা-সাক্ষত শেষে করে) নিজের গন্তব্যে ফিরে যেতে হবে পোপকে ৷ মুসলমানদের মাঝে কোন ধরনের তৎপরতার শক্তি যোগান দিতে পারবেন না ৷ কোন মিশনারীকে চাঙ্গা করতে পারবেন না ৷ আর শান্তিকামি হয়ে থাকলে, প্রকৃত শান্তিতে বিশ্বাসী হলে ইসলাম সম্পর্ক জানতে চাইবেন ৷ ভালো লাগলে ইসলামের ছায়ার সুস্বাগতম ৷
ব্যস, এতটুকুই ৷
.

※ শিরোনামের দ্বিতীয় প্রসঙ্গেঃ
আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী সাহেব পোপকে যে স্বাগত জানিয়েছেনে সেটাকে আমি বা আমরা সমর্থন বা অসমর্থন করার কিছু নেই ৷ আমরা এমন কেউ নই যে, আমাদের সমর্থনে হুজুরের অগ্রযাত্রা একধাপ এগোবে, অথবা আমাদের অসমর্থনের ফলে হুজুর পিছিয়ে যাবেন অনেক দূর ৷

তবে যেটা হয়েছে সেটা হল, প্রচলিত রাজনীতির (গণতন্ত্রের) কু-প্রভাবে একজন পলিটিশিয়ান হিসেবে হুজুরকে ঐ ফরমালিটিটা করতে হয়েছে ৷ অথবা কেউ করিয়েছেন ৷ অনেকের মত আমিও বলি, হুজুর এমনটি না করলেও তেমন কোনো ক্ষতি হতো না ৷

আমার মনে হয়, রাজনীতির জায়গা থেকে কাসেমী সাহেব হুজুর কোন ভুল করেন নি ৷ হয়তোবা উপযুক্ত কাজটাই করেছেন ৷
(আমাদের পক্ষ থেকেও একটা ভূমিকা থেকে গেলো)

হুজুর তো আর তাকে গার্ড অব অনার দিয়ে স্যালুট করেন নি ৷ অথবা ঢাকঢোল পিটিয়ে তার সম্মানে কোন আয়োজন করেন নি ৷

শুধুমাত্র স্বাগত জানিয়েছেন ৷
এর অর্থ এটাও হতে পারে যে, মুসলিং দেশে তাকে স্বাগতম ৷ মুসলমানরা শান্তি প্রিয় ৷ তাই তো অশান্তি সৃষ্টিকারিদের সাথেও সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে যাচ্ছে রাসূলের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ৷ রাসূলও তো অমুসলিমদের সাথে উত্তম আচরণ করেছেন ৷ যাতে মুগ্ধ হয়ে অসংখ্য বিধর্মী ইসলাম ধর্মে দিক্ষিত হয়েছে ৷

আনাস বিন ইউসুফ: শিক্ষার্থী ও অনলাইন  এক্টিভিস্ট