দৃশ্যমান ভূমিকায় আসতে আলেমদের সামনে প্রতিবন্ধকতাসমূহ

467
সৈয়দ শামছুল হুদা

বাংলাদেশে অনেক মেধাবী, পরিশ্রমী, যোগ্য, প্রতিভাবান আলেম আছেন এতে কোন সন্দেহ নেই। দ্বীনি খেদমত, কুরআন ও হাদীসের তা’লীম তারবিয়্যাত বিষয়ে তারা অতুলনীয় ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। এদেশের উলামায়ে কেরাম রাষ্ট্রীয় কোন সহযোগিতা পান না। চানও না। নিজ নিজ পরিমন্ডলে সাধ্য অনুসারে কাজ করে যাচ্ছেন। উলামাদের মেহনতের ফলেই দেশে আজ হাজার হাজার মাদরাসা-মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দ্বীনি মারকাজসমূহ চালু হয়েছে। এদেশে যে কোন অপশক্তি সরাসরি দ্বীন বিরোধী কোন কাজের সাহস করে না। নানা ফন্দি এঁকে তারপর সেটা বাস্তবায়ন করে। কাজ করার আগে অনেকবার তারা চিন্তা করে, এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সেটা নিয়ে ভাবে।

তদুপরি একটি প্রশ্ন দেখা দেয়, অনেকেই করে। উলামাদের অবদান কী? আলেম-উলামাগণ দেশ ও জাতির জন্য কী কাজ করছে? গবেষণাক্ষেত্রে উলামাদের ভূমিকা কী? এর কারণ হিসেবে মনে করি প্রচার ও প্রকাশনা জগত থেকে উলামাদের দূরে থাকাই মূল কারণ। এদেশের আলেম সমাজ এত কাজ করার পরও, এত শ্রম দেওয়ার পরও এ প্রশ্ন এ কারণে আসে যে, দৃশ্যমান ভূমিকায় আলেমদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় না। আলেম-উলামাদের জগতের বাইরের মানুষগুলো এই জগতের শ্রম ও সাধনা নিয়ে চিন্তা করে না। আরও একটি বিষয় হলো- এদেশের বড় বড় আলেমদের কোন ওয়েবসাইট নেই। ইউটিউব চ্যানেল নেই। গবেষণা কার্যক্রম সীমিত। এক বোন সম্প্রীতি স্টেটাস দিয়ে লিখেছে: এদেশের আলেম সমাজ কিছুই করে না। তাদের নিকট থেকে আমরা কিছুই পাই না। অথচ বহির্বিশ্বের আলেমদের কত সুন্দর সুন্দর ওয়েবসাইট, গবেষণামূলক কার্যক্রম দেখতে চাই।’’ এ লেখাটায় এক ভাই আমাকে ম্যানশন করেছেন। এ বিষয়ে কিছু কথা বলা দরকার মনে করছি।

প্রথমত: এদেশের আলেম সমাজকে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। ফারেগ হওয়ার পর তার সামনে কর্মস্থলের কোন ব্যবস্থা থাকে না। সীমিত জায়গাগুলোতে খুব সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়। হয় কোন মাদ্রাসায় অথবা কোন মসজিদে সামান্য বেতনে খেদমত মিলে। অনেকের ভাগ্যে তাও জোটে না। ফলে উপায়ন্তর হয়ে নিজেই শুরু করেন কোন মসজিদ এর কাজ, অথবা প্রতিষ্ঠা করেন কোন মাদ্রাসার। যখন সেই সকল মসজিদ ও মাদ্রাসা বড় আকার ধারণ করে, তখন দেখা দেয় নতুন সমস্যা। তখন প্রতিষ্ঠাতা হয়ে যান অযোগ্য, যোগ্য লোকের সন্ধানে অনেকেই কানাঘুষা শূরু করেন। তখনও টিকে থাকতে হয় অনেক কৌশল করে। এতসব কারণে এদেশের আলেমগণ নতুন নতুন সৃষ্টিশীল কাজে সময় দিতে পারেন না। দৃশ্যমান কাজগুলো করার দিকে মনযোগ দিতে পারেন না।

দ্বিতীয়ত: এদেশের আলেমদের সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলিয়ে উঠতে পারেন না। অন্যান্য দেশের ইসলামিক স্কলারগণ যে ধরণের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পান, আর্থিক নিরাপত্তা পান সেটা এদেশের আলেম সমাজ কখনই পায় নাই। ফলে একটি করতে গেলে অন্যটি করা হয়ে উঠে না। যেমন অধিকাংশ আলেম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনেই সারাটি জীবন শেষ করে দেন। ফলে সুস্থির সাথে নিজের যোগ্যতাকে বিকশিত করার, তুলে ধরার, প্রকাশ করার সুযোগগুলো গ্রহন করতে পারেন না।বিশেষভাবে দারুল উলুম দেওবন্দের যে চেতনা নিয়ে এদেশের আলেমগণ বেড়ে উঠেন, সেটা হলো রাষ্ট্রীয় কোন সহযোগিতা দ্বীনি কাজে নেওয়া যাবে না। তিক্ত হলেও সত্য, বৃটিশ বিরোধী চেতনা এখনো সক্রিয়। যে কোন সরকারকেই আপন মনে করা হয় না। মুসলমানদের বন্ধু মনে করা হয় না।ফলে কখনো কখনো সরকারের সাথে সমঝোতামূলকভাবে চললেও কওমী উলামায়ে কেরাম রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাকে সবসময়ই তাদের প্রতিপক্ষ মনে করে। এটা বাস্তবতা।ফলে রাষ্ট্রের সাথে কওমী উলামাদের দূরত্ব থেকেই যায়।

তৃতীয়ত: কিছু কৌশলগত অবহেলাও বড় একটি কারণ। প্রযুক্তিভীতিও সক্রিয়। এদেশে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গবেষণা কাজের সাথে জড়িত। তাদের দ্বীনি বিষয়ে বেশকিছু মূল্যবান গবেষণা রয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কিন্তু এগুলোকে মিডিয়ায় তুলে ধরা, প্রকাশনামান উন্নত করার ক্ষেত্রে রয়েগেছে ক্ষমাহীন উদারতা। যেমন এদেশে প্রতি শুক্রবার যে মূল্যবান আলোচনা গুলো হয় সেগুলোর লিখিত কোন রূপ নেই। অন্যান্য দেশে বড় বড় খতীবদের লিখিত খুতবার বই থাকে। বাংলাদেশের বড় বড় আলেমগণ বক্তব্যগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষণ করেন না। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাগুলোর ব্যাপক প্রচার ও প্রসার হয় না। ফলে মানুষ জানতেই পারে না এদেশের আলেম সমাজের কোন প্রকাশনা বা গবেষণা আছে কি না? বড় একটি বাধা হলো এদেশের জাতীয় প্রকাশনাগুলো আলেমদের প্রকাশনা প্রকাশ করতে অনিহা দেখায়।প্রকাশ করে না। জাতীয় বইমেলায় ইসলামী বইয়ের স্টল পর্যন্ত দিতে চায় না।নানাভাবে ইসলামী প্রকাশনার ওপর চাপ সৃষ্টি করে রাখা হয়। বর্তমানে শুরু হয়েছে নতুন ফেতনা। ইসলামী বই মানেই জিহাদী বই, জঙ্গীবাদি বই। ইত্যাদি বলে জনমানুষের মনে এক প্রকার ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আলেমদের লিখনী পাঠ ও পঠনের ব্যাপারে। তারা ইসলামী কোন ভালো বইও কিনতে চায় না।

মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ. অসংখ্য মূল্যবান বই লিখেছেন। মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত গবেষণা হচ্ছে। মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ দা.বা. একটি পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস দাঁড় করানোর শেষ প্রান্তে। কতটা সাহস এবং যোগ্যতা থাকলে একজন মানুষ একটি স্বতন্ত্র সিলেবাস তৈরী করতে পারে? জেনারেল ধারায় একজন ব্যক্তি সিলেবাসের একটি বই লিখলেই তাকে স্মরণীয় বরণীয় মনে করা হয়। কিন্তু একজন মাওলানা আবু তাহের মিছবাহকের স্মরণ করা হয় না। রাষ্ট্র তাঁর মেধাকে মূল্যায়ন করে না। ড. আ ফ ম খালেদ হোসাইন, মাওলানা যাইনুল আবেদীন, মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন অনেকগুলো গবেষণামূলক বই লিখেছেন। আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. এদেশে বাংলা ভাষায় গবেষণার সূত্রপাত করে যান। অথচ সেগুলোর রাষ্ট্রীয় কোন পৃষ্টপোষকতা নেই। সে গুলো প্রকাশ করার জন্য জাতীয় কোন প্রকাশনা সংস্থাও নেই।

চতুর্থত: এছাড়া জেনারেল শিক্ষিতদের অবহেলা। মিডিয়ার বিষয়ে এদেশের আলেমগণ কিছুদিন আগেও কোনরূপ ধারণা রাখতেন না। বর্তমানে যখন একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছেন, তখন দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যক্তি যারা অনলাইন ডিজাইনে এক্সপার্ট তারা সহযোগিতা করছে না। যেমন ড. শামসুল হক সিদ্দীক দা.বা. ও ইউসুফ সুলতান ভাই মিলে শাবাকা শফট লি. নামে একটি ওয়েব ডিজাইন ফার্ম খুলেছিলেন। সেখানে যে ইঞ্জিনিয়ার ছিল তার ব্যবহারে খুব দ্রুতই সে ব্যবসা বন্ধ করতে হয়। আমি একটি ওয়েব সাইট চালাই।আমি তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- বছরের পর বছর ঘুরিয়েও ওয়েব ডিজাইনাররা কাজ সমাধা করে দেয় না। চোখ বন্ধ করে মিথ্যা কথা বলে। একজন আলেম এ সমস্ত লোকদের পিছনে ঘুরঘুর করতে অভ্যস্ত না। শাবাকা সফট অল্প কিছুদিনের ভিতরই ভালো একটি সাড়া ফেলে দিয়েছিল উলামাদের অঙ্গনে। তারা এক্ষেত্রে সফল হয়েছিলেন যে, উলামাদের গবেষণামূলক কার্যক্রম প্রকাশের জন্য সকলের একটি করে ওয়েবসাইট থাকা উচিত।বড় বড় মাদ্রাসাগুলোকে নিজস্ব ওয়েব সাইট করার বিষয়টি বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু সে ঢেউ খুব তাড়াতাড়িই বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ শিক্ষিতরা নানাভাবে আলেমদের কাজের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। মিডিয়ায় ভালো আলেমদের দাওয়াত দেওয়া হয় না। কথা বলতে দেওয়া হয় না। ‍ওয়েব ডিজাইনাররা সহযোগিতা করে না। সব ওয়েব ডিজাইনার এর মেজাজ থাকে অন্য রকম। কেমন জানি একটু ব্যতিক্রম। ফলে উলামাগণ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। আলেমদের মধ্যে থেকেই যদি এসব বিষয়ে এক্সপার্ট লোক তৈরী হয়, তখন যদি এইসব সমস্যার সমাধান হয়।

পঞ্চতম: এদেশে যে পরিমান কথা বলার সুযোগ আলেমদের এখনো আছে, সেটা অন্যান্য অনেক দেশে নেই। যেমন মাহফিলগুলোতে দীর্ঘ সময় নিয়ে গবেষণামূলক আলোচনা করার সুযোগ এদেশের আলেম সমাজ পায়।ব্যাপকাকারে এদেশে মাহফিল হয়।কিছু সংখ্যক আলেমদের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা থাকলেও অনেক আলেম এমন সব আলোচনা মাহফিলগুলোতে করেন যে গুলো গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করা দরকার ছিল। কিন্তু সেগুলো হারিয়ে যায়। ধরে রাখা হয় না। এগুলো ধরে রাখতে পারলে অনেক সাধারণ মানুষ আরওবেশি উপকৃত হতে পারতো। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাভাষি ভাইদের উপকার হতো। সেগুলোর সামান্যতম অংশও মিডিয়ায় আসে না। বর্তমানে কিছু কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সুফলও মানুষ পাচ্ছে। এগুলো যদি সংরক্ষণ করা হতো, দেখা যেতো অনেক মূল্যবান আলোচনা আলেমদের থেকে এসেছে।

এছাড়া জুমআর মিম্বরগুলো আলেমদের জন্য একান্তভাবেই বরাদ্দ। তারা প্রতিনিয়ত বয়ান করেই যাচ্ছেন। ব্যতিক্রম বাদে অনেকেই জুমআর দিন সুন্দর আলোচনা করেন। গঠনমূলক আলোচনা করেন। গ্রামাঞ্চল বা সাধারণ কিছু মসজিদের খতীবদের কথা বাদ দিলাম। লক্ষ খতীবের আলোচনা ধর্তব্য নয়।সারাদেশ থেকে কমপক্ষে এমন একহাজার আলেম পাওয়া যাবে, যাদের আলোচনা উঁচুমানর। জুমআর দিনের সেই বয়ানগুলোও যদি সাজানো আকারে, অডিও, ভিডিও আকারে আসতো, বা লিখিত আকারে আসতো, তাহলে দেখা যেতো অনেক অনেক গবেষণাপত্র তৈরী হয়ে গিয়েছে। অন্যান্য দেশের আলেমদের কথা বলার সুযোগ সীমিত। ফলে তারা ইউটিউব চ্যানেল ব্যবহারে উদ্যোগী হন। মান সম্পন্ন ওয়েব সাইট তৈরী করেন। আরবী ও ইংরেজিতে অসংখ্য মান সম্পন্ন ইসলামিক ওয়েবসাইট রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, এদেশে শুধু আলেমগণই নয়, সাধারণশিক্ষিত মানুষও এসব ক্ষেত্রে পশ্চাদপদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণকরা বিদেশি গবেষণা চুরি করে ডিগ্রী অর্জন করে। তারাও আজ মানের জায়গায় নেই।

সর্বশেষ যে কথাটি বলতে চাই, সেটা হলো এদেশে অনেক যোগ্য আলেম আছে। কিন্তু তারা প্রকাশমান কাজের সাথে সম্পৃক্ত নন। এটা সত্য যে, তারা তাদের লিখনীসমূহ, চিন্তাশীল কাজসমূহ এখনো ডিজিটাল পদ্ধতির সাথে মিলিয়ে এগিয়ে আসতে পারেন নি।তবে আশার কথা এই যে, খুব শীঘ্রই ইনশাআল্লাহ এই সংকটও কেটে যাবে। দৃশ্যমান কাজের সাথে একদল আলেম এক্সপার্ট হয়ে বেরিয়ে আসছে।পৃষ্টপোষকতা পেলে প্রতিবছর কমপক্ষে ১০০০বই বের হয়ে আসবে যে গুলো গবেষণামূলক। এদেশে হাজারো আলেম আছে যারা মান সম্পন্ন ওয়েব সাইট করতে পারেন। গবেষণামূলক কাজ তুলে ধরতে পারেন।নিজস্ব চ্যানেল করে আলোচনাগুলো সংরক্ষণ করতে পারেন। এ বিষয়টার প্রতি শ্রদ্ধেয় আলেমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।

সৈয়দ শামছুল হুদা: আলেম, লেখক গবেষক।