কওমী সনদের সরকারি স্বীকৃতির ঠিকানা ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় নয়

539
লাবিব আব্দুল্লাহ্

কওমী মাদরাসার ঐতিহ্য রয়েছে৷ রয়েছে সংগ্রামী ইতিহাস৷ কওমী মাদরাসার ইতিহাস সাড়ে চৌদ্দ শত বছরের ইতিহাস৷ দীনি শিক্ষাধারাটিই হলো কওমী ধারা৷ কওমী বাংলাদেশে পরিচিত হলেও অন্যদেশে দীনি মাদরাসা, মাদারিসে ইসলামিয়া নামে পরিচিত৷ অতীতে যা সুফফা ও দারুল আরকাম বর্তমানে তা কওমী মাদরাসা৷ নামের ভিন্নতা থাকলেও উদ্দেশ্য কুরআন সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষা৷
উপমহাদেশে ইসলাম যতদিন থেকে কওমী শিক্ষা তখন থেকেই৷ এ দেশে আশি হাজার মকতব ছিলো বৃটিশ বেনিয়ারা তা ধবংশ করেছে৷ এ দেশে দীনি শিক্ষার জন্য লাখেরাজ ভূমি ছিলো৷ ছিলো ওয়াকফ সম্পত্তি৷ এইসব সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশরা হরণ করেছে৷ লুটেরা ইংরেজরা দস্যুপনা করে ধবংশ করেছো হাজার হাজার মাদরাসা৷
1757 সালের পর মাদরাসার ইতিহাস ভিন্নরুপ রুপান্তরিত হয় বাংলায়৷ 1857 সালের পর দিল্লির মাদরাসায়ে রহিমীয়াসহ হাজার হাজার মাদরাসা বিলুপ্ত করে ইংরেজ শাসকরা৷
কেরানী বানানোর জন্য মুসলমানদের হাত থেকে ক্ষমতা দখল করে লর্ডম্যাকলের চিন্তায় এই দেশে আমদানি করা হয় স্কুল কলেজের শিক্ষা৷ আমদানি করা হয় ধর্মহীন শিক্ষা৷
সেই জালেম ইংরেজরা কোলকাতায় প্রতিষ্ঠা করে আলিয়া মাদরাসা৷ আলিয়া মাদরাসা করা হয় 1780 সালে৷
আমি আলিয়ার ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না৷ আজকের সময়ে যেকোনো আলিয়া মাদরাসায় পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যেতে পারে কী করুণ দশা পরিবেশ ও শিক্ষার৷ স্কুল ও কলেজের সিলিবাসের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে ধ্বংশের পথে আলিয়া৷ ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে৷ স্কুল ও আলিয়ার একই পাঠ্যক্রম কিছু আরবী কিতাব ছাড়া৷
কলিকাতা আলিয়া এখন একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই৷ পশ্চিম বঙ্গের আলিয়ায় সহশিক্ষা এবং হিন্দুরাও পড়ালেখা করতে পারে৷ বাংলাদেশে আলিয়া মাদরাসাতেও সহশিক্ষা৷ দীনি পরিবেশ রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে৷
সুফফা দারুল আরকামের ঐতিহ্যধারণ করে চলছে কওমী মাদরাসা৷ 1867 সালে উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনামলে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে প্রতিষ্টা হয় দারুল উলূম দেওবন্দ৷ শাসকদের লোভাতুর চোখ থেকে মুক্তির জন্য গণচাঁদাকে উসূল করা হয়৷ জনসম্পৃক্ততার জন্য দীনদারদের দানগ্রহণ করাকে উসূল বা মূলনীতি করা হয়৷ সরাকরি হস্তক্ষেপ থেকে বাঁচার জন্য স্থায়ী সম্পদও করতে নিষেধ করা হয় উসূলে হাস্তগানায়৷ বাংলাদেশের কওমী মাদরাসা সেই উসূলের উপর চলছে সেই শতবছর থেকে৷
সরকারি সহযোগিতা না নিয়ে এই পথচলা পাকিস্থান আমলেও ছিলো আজও আছে৷ ঐটি নানা হিকমার কারনে৷
তাতে ভিন্নমত থাকতে পারে তবে আলিয়া মাদরাসার পরিনাম থেকে ইবরত হাসিল করা যেতে পারে৷ সরকারি করলে কী হয় তা আলিয়ার সিলেবাস দেখলেই চলবে৷

কওমী সনদের সরকারি স্বীকৃতি সময়ের প্রয়োজনে নিতে অধিকাংশ একমত৷ তবে চিন্তাশীল আলেমদের দ্বিমতও আছে৷ স্বকীয়তা বজায় থাকবে কি না কওমীর তা নিয়ে নানা কথা আছে৷ সবকিছুর পরও কওমীধারার ছয়টি বোর্ড একত্রিত হয়ে গঠণ করেছে হাইআতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কাওমিয়া৷ যদিও নামটি সুন্দর হয় নি তবুও একটি প্লাটফর্ম৷ গত শিক্ষাবর্ষে কেন্দ্রীয় পরীক্ষাও নিয়েছে হাইতুল উলইয়া৷ কিন্তু সরকারি স্বীকৃতির ঘোষণা বাস্তবায়ণে জন্য যথাযথ উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় নি গত ছয়মাসে৷ চলছিলো ধীরগতিতে৷
এরপরের পথচলা নিয়ে কথা৷ সরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে যার নাম ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়৷ আলিয়া মাদরাসার ফাজিল ও কামিলের পরীক্ষা হয় এই আরবি ভার্সিটির অধীনে৷ সেটি আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক ছাত্রদের আন্দোলনের ফসল৷
কওমী মাদরাসার নেসাব,নেজামের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই সেই আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের৷ সেই ভার্সিটির ভিসি কওমীর কেউ না৷ কওমীর কেউ কখনও ভিসি হবেন সেই সম্ভাবনাও নেই৷ ভিসি হতে হলে যা শর্ত তা কওমীর নেই৷ কওমী মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি দিতে হলে যে শর্ত প্রয়োজন তা সেই ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই৷ বিষয়টি বিস্তর আলোচনার দাবি রাখে৷
বিস্ময়কর বিষয় হলো কওমীর দাওরার সনদকে সেই ইসলামি আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেবার পরিকল্পনা চলছে৷
যদিও কওমীধারার আলেমরা রহস্যময় কারনে নীরব কিন্তু যেদিন তাঁরা উপলব্দি করবেন যে, কওমীর উচ্চশিক্ষা আলিয়ার পথে তখন তাঁরা জেগে উঠবেন এবং তা কখনও বাস্তবায়ণ হতে দেবেন না৷
অদূরদর্শী যেসকল বুযর্গানে কেরাম সনদের বিষয়টিকে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়ার পথ রচনা করে দিচ্ছেন তাঁরা কওমী আলেমের ধিক্কারপ্রাপ্ত হবেন৷ ধিকৃত হবেন৷ সনদের বিকৃতির জন্য ইতিহাসে কওমীর ক্ষতিকর ব্যাক্তি হিসেবে পরিগনিত হবেন বলে অভিজ্ঞরা মনে করেন৷
অথবা তাঁরা সরল বুযুর্গ হিসেবে এখন পরিনাম উপলব্দি করছেন না৷ যখন হুশ ফিরবে তখন তাঁরা অনুতাপ করবেন৷
আমার মনে হয় সরকার কওমীর স্বীকৃতি শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করবে বা আলেমগন কথা বলবেন যে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কওমীর সনদের ঠিকানা নয়৷
সময় বলে দেবে কী হয়৷ আমার বিশ্বাস কওমীর সনদের সরকারি স্বীকৃতি দ্রুত বাস্তবায়ণ হবে না৷ হলেও তা স্বকীয়তা রক্ষা করে সম্ভব হবে না৷
স্বীকৃতির বাস্তবায়ণ যাদের হাতে তাঁরা কওমীর ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে বেশী ধারণা রাখেন বলে আমার মনে হয় না৷
কওমীর ঐতিহ্য যারা জানেন তাদেরকে বাস্তবায়ণের দায়িত্ব দেবে সরকার এই প্রত্যাশা৷
পক্ষান্তরে কওমী সনদের সরকারি স্বীকৃতি হলে কী হবে তা নিয়ে ভাববেন এই প্রত্যাশা আলেমদের দরবারে৷আলেমদের বিবেকের কাছে গভীর ভাবনার আবেদন রইলো।

মাওলানা লাবিব আব্দুল্লাহ, লেখক ও গবেষক