ক্রিকেট নিয়ে সর্বনাশা জুয়া, এখনই লাগাম টানতে হবে

581
theislam24

আবদুল্লাহপুরের মুদি দোকানি কায়েস (ছদ্মনাম)। দিন শেষে তার রোজগার পাঁচশ’ বা তার কিছু বেশি। কিন্তু যেদিন কোনো দলের ক্রিকেট খেলা থাকে সেই দিন তার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ক্রেতাকে পণ্য দেওয়ার ফাঁকেই দোকানের সেলফে থাকা টিভিতে চোখ বুলিয়ে নেন। তার দোকানের সামনে রাখা লম্বা টুলে দুপুর গড়াতেই এসে ভিড় করেন স্থানীয় কিছু লোক। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সবাই নিপাট ক্রেতা। আর কায়েস ব্যস্ত বিক্রেতা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

কায়েস ও তার দোকানের সামনে ভিড় করা তরুণ, ছাত্র কিংবা মাঝ বয়সী ব্যবসায়ীসহ যারা আছেন, সবাই টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখেন আর বাজি ধরেন। তাদের বাজি টাকার অংকে খুব বড় নয়। কিন্তু নেশাটা ভয়ঙ্কর। তাদের অনেকেই ইতিমধ্যে সর্বস্ব খুইয়েছেন। কিন্তু এটা নিয়ে তাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। বরং নানা কায়দায় অর্থ সংগ্রহ করে প্রতিদিন ক্রিকেট বাজির নামে জুয়া খেলায় মেতে উঠেন।

সোমবার (৬ সেপ্টেম্বর) এমনই ক্রিকেট জুয়ায় বাঁধা দেওয়ায় রাজধানীর মধ্যবাড্ডায় ছুরিকাঘাতে মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাসিম আহমেদকে হত্যা করা হয়েছে। নিহত নাসিম আহমেদ মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র। চলতি বিপিএল নিয়ে ক্রিকেট জুয়ার জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন নাসিমের ভাই ইফতেখার আহমেদ ফয়জুদ্দিন। 

স্থানীয় কয়েক জন ক্রিকেট জুয়াড়ির সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তারা খেলা শুরুর আগে কয় উইকেটে কোন্ দল জিতবে, কোন্ খেলোয়াড়ের কত ওভার মেডেন হবে, কত ওভারে কত রান হবে, কোন্ খেলোয়াড় হাফ সেঞ্চুরি বা সেঞ্চুরি করবে- এসব বিষয়ে বাজি ধরা হয়। অনেক সময় বলে বলেও বাজি ধরা হয়। আর বাজির টাকা নগদে পরিশোধ করতে হয় সঙ্গে সঙ্গে। টাকা না থাকলে সুদে ঋণ দেওয়ারও ব্যবস্থা আছে। 

শুধু কায়েসের দোকানে নয়, এমন ক্রিকেট জুয়া মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। ক্রিকেট জুয়ার ছড়াছড়ি সমাজের অভিজাত-শিক্ষিত শ্রেণি ছাড়িয়ে তরকারি বিক্রেতা, নাপিত, হোটেল কর্মচারী, ফল বিক্রেতা, বিভিন্ন পরিবহনের শ্রমিক (হেলপার ও কন্ডাক্টর) নির্মাণ শ্রমিকসহ বিভিন্ন নিম্ন পেশার লোকেরা জড়িয়ে পড়ছে। বাদ পড়ছে না স্কুল ও কলেজগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও। কোনো কোনো অফিসেও নাকি সহকর্মীরা নিজেদের মধ্যে বাজি ধরছেন। ক্রিকেট জুয়ায় টাকা-পয়সা খুইয়ে আত্মহত্যার মর্মান্তিক খবরও শুনতে হয় কখনো সখনো।  

অনেকে এও বলছেন, কিছু ক্রিকেট জুয়াড়ি জুয়ার টাকা যোগাতে গিয়ে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে ক্রিকেট জুয়ার হারজিতকে কেন্দ্র করে পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। 

জুয়া একটি ঘৃণিত ও গর্হিত কাজ। এটি একটি মারাত্মক সামাজিক অপরাধ। ইসলামের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ অবৈধ ও হারাম। ইসলামপূর্ব যুগে জুয়ার কার্যক্রম ব্যাপক আকারে প্রচলিত ছিলো। তারা এর প্রতি এমন আসক্ত ছিলো যে, কখনো কখনো স্ত্রী-ছেলেমেয়েদেরও বাজির উপকরণ বানিয়ে ফেলতো। 

বর্তমানে অনেক খেলাকে কেন্দ্র করে আড়ালে-আবডালে বিশ্বব্যাপী চলে অবৈধ জুয়া। বিশেষ করে ক্রিকেট খেলা নিয়ে। যেটা আমরা লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছি। জুয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়াকে হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা ও লটারি এসবই শয়তানের কাজ।  তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাকো। আশা করা যায়, তোমরা সফল হতে পারবে। নিশ্চয়ই শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং আল্লাহর জিকির ও নামাজ থেকে তোমাদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে। তাই তোমরা এসব জিনিস থেকে বিরত থাকবে।’ -সূরা মায়েদা: ৯০-৯১

হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধু জুয়াকে হারাম করেননি, বরং জুয়ার ইচ্ছা প্রকাশকেও গোনাহ সাব্যস্ত করেছেন। যে ব্যক্তি অপরকে জুয়া খেলার জন্য ডাকবে তাকেও গোনাহর প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে কিছু সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি অপরকে জুয়া খেলার প্রতি আহ্বান করবে, তার উচিত কিছু সদকা করে দেওয়া।’ –সহিহ বোখারি শরিফ

জুয়া সামাজিক শান্তি বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরই মধ্যে যেহেতু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে গেছে, তাই এই সামাজিক ব্যাধি বন্ধ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশেষ করে ব্যস্ত বাজার ও পাড়া-মহল্লায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়িয়ে দিলে এই নেতিবাচক কাজ থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হবে। দেরি হয়ে গেলে এর প্রভাব পড়বে সর্বত্র। সমাজে বড় ধরনের কোনো সর্বনাশ হওয়ার আগেই লাগাম টেনে ধরতে হবে। বন্ধ করতে হবে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড। বিষয়টি নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেই মঙ্গল। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও তাই।