শত ষড়যন্ত্রের মাঝেও ইসলামের বিস্ময়কর অগ্রযাত্রা

798

কামরুল হাসান দর্পণ: এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত, নির্যাতিত এবং বিভিন্ন অজুহাতে দমন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে মুসলমানরা। বিশ্বে আর কোনো ধর্মালম্বীর এত সংকটের মধ্যে নেই। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, প্যালেস্টাইন থেকে শুরু করে সর্বশেষ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর যে হত্যা-নির্যাতন এবং উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চলছে, তা আর কোনো ধর্মাবলম্বী মানুষের উপর হচ্ছে না। উদ্বাস্তু ও শরণার্থীর সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি মুসলমানদের মধ্যে। জাতিসংঘের এক হিসাবে বলা হয়েছে, আইএস ধ্বংসের নামে সিরিয়ায় বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো একের পর এক যে হামলা চালাচ্ছে, তাতে ১৮ লাখ মানুষ ঘর-বাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। এসব মানুষ বিভিন্ন সময়ে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে লাখ লাখ সিরিয়ান নিজ দেশেই উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে। গত এক মাসের অধিক সময় ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর দেশটির সেনাবাহিনী, বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং মগরা যে বর্বর হত্যা, নির্যাতন ও বিতাড়ন চালাচ্ছে, তাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশ ত্যাগ করেছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইতোমধ্যে বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হয়ে এসেছে ৪ লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। অবশ্য আগে থেকেই প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে বসবাস করছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বলা যায়, বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো প্রচ্ছন্নভাবে মুসলমানদের শত্রæজ্ঞান করছে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে এক ধরনের অলিখিত ‘ক্রুসেড’ চলিয়ে যাচ্ছে। মূলত সহ¯্রাব্দের শুরুতে এবং মধ্য যুগে ল্যাটিন চার্চের পাদ্রীদের দ্বারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদে যে ক্রুসেডের সূচনা করা হয়, তাই যেন নতুন রূপে সা¤্রাজ্যবাদী দেশগুলো মুসলমানদের উপর চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য ইসলামী জঙ্গী ও সন্ত্রাস দমনের নামে তারা মধ্যপ্রাচ্য ও অফ্রিকার মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে দেশগুলোকে অশান্ত ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। পাশাপাশি ইসলাম এবং এর অনুসারীদের দোষারোপ ও বদনাম করার জন্য এক জোট হয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রপাগাÐা চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ তারা ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অজুহাতে অলিখিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এতে তারা এক ঢিলে দুই পাখি মারার প্রক্রিয়া অবলম্বন করছে। প্রথমত, ইসলাম ও মুসলমানদের বদনাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া। দ্বিতীয়ত, তেল ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশগুলোর সম্পদ লুণ্ঠন করা। বলা বাহুল্য, এ কাজটি তারা সুপরিকল্পিতভাবে করছে। নিজেরাই অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে একশ্রেণীর বিভ্রান্ত মুসলমানকে দিয়ে খেলাফত প্রতিষ্ঠার নামে সংগঠন সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে মুসলমানদের ভেতর শিয়া-সুন্নি দ্বন্ধ সৃষ্টি করে আত্মঘাতি সংঘাতে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। ইরাক ও সিরিয়ার দিকে তাকালে এ চিত্র দৃশ্যমান হয়ে উঠে। বর্তমান বিশ্বে জঙ্গী গোষ্ঠী হিসেবে যে আইএসকে বলা হয়, তা যে যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টি, তা এখন সকলেরই জানা। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সেই আইএস দমনের নামে ইরাক ও সিরিয়াকে তছনছ করে দিয়েছে। সর্প হয়ে দংশন ও ওঝা হয়ে ঝাড়ার, তাদের এ নীতির মূল লক্ষ্যই হচ্ছে, ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিশ্বব্যাপী বিদ্বেষ সৃষ্টি করা।
দুই.
পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী দেশগুলো কেন ইসলাম ও মুসলমানদের দোষারোপ এবং তাদের প্রতিপক্ষ ধরে নিয়েছে, এ প্রশ্ন আসতে পারে। এর মূল কারণ হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ইসলাম ধর্মের প্রতি ব্যাপক সংখ্যক মানুষের ঝুঁকে পড়া। ইসলামই এখন বিশ্বে একমাত্র ধর্ম, যার অনুসারীর সংখ্যা দ্রæতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান বিশ্বে অন্য ধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়া মানুষের হার সবচেয়ে বেশি। ব্যাপক হারে মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে। বিগত কয়েক বছরে সারাবিশ্বে মুসলমানের সংখ্যা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে তা ১০০ কোটি ৭০ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ২০০ কোটি ১৮ লাখে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা দ্রæত বর্ধিত হচ্ছে। অন্যদিকে খ্রিস্টান জনসংখ্যা ২০০ কোটি ১০ লাখের মতো। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক দেশ তাদের মুসলমান নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করে না। ভারত, চীন, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া, ইথিওপিয়াসহ অনেক দেশ মুসলমান নাগরিকদের যে সংখ্যা প্রকাশ করে, বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি। সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে ব্যাপক হারে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা তাদের বিশ্বাস থেকে সরে যাচ্ছে। অন্যদিকে মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাস চিরকাল ধরেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবেদনে একটি তাৎপর্য্যপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, সারা বিশ্বে যে হারে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে ২০৩০ সালে দেখা যাবে, প্রতি তিন জন মানুষের মধ্যে একজন মুসলমান থাকবে। তার অর্থ হচ্ছে, ইসলামের প্রতি মানুষের এই অগাধ বিশ্বাস ও আকর্ষণ এতটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে যে অসংখ্য ধর্মের মধ্যে ইসলামই শীর্ষে অবস্থান করবে। প্রতি তিন জনে একজন মুসলমান হলে বাকি দুইজন কোন ধর্মের তা প্রতিবেদনে উল্লেখ না করলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাকি দুই জনের মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে হবে তা হিন্দু হোক, বৌদ্ধ হোক কিংবা খ্রিস্টান হোক। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক জনসংখ্যা বিষয়ক সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারও সম্প্রতি এক জরিপে বলেছে, ২০৫০ সালের দিকে জনসংখ্যার দিক থেকে মুসলমানরাই হবে এক নম্বর। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতের জনসংখ্যারও প্রায় অর্ধেক হবে মুসলমান। সম্প্রতি চীনে এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনা তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। চীন সরকার মুসলমানদের রোজা রাখা ও নারীদের হিজাব পরাসহ ইসলাম পালন নিষিদ্ধ করার পর ইসলামের প্রতি তরুণদের এই আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বেইজিংয়ের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক পরিচালিত ‘চীনা ধর্ম জরিপ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ৩০ বছরের নিচের তরুণদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। চীনের সর্বশেষ আদম শুমারি অনুসারে উইঘুর মুসলমানদের সংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখ। তবে প্রকৃত সংখ্যা দেড় কোটি বলে উইঘুর আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন উল্লেখ করেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার তার গবেষণায় বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনে মুসলমানদের সংখ্যা হবে ৩ কোটি। ইসলামের এই অগ্রযাত্রায় স্বাভাবিক কারণেই পশ্চিমা বিশ্বসহ অন্যান্য সা¤্রাজ্যবাদী দেশ ভীত হয়ে উঠেছে। এই অগ্রযাত্রা ঠেকাতে তারা বিভিন্ন ষড়যন্ত্রও শুরু করেছে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইসলাম ও এর অনুসারীদের বদনাম ছড়ানোর কৌশল নিয়েছে তারা। এজন্য মুসলমানদের একটি বিভ্রান্ত গোষ্ঠীকে সংগঠিত করে সন্ত্রাসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইসলামকে দোষারোপ করার বড় পদক্ষেপটি নেয়া হয় ২০০১ সালে, যা নাইন-ইলেভেন নামে পরিচিত। বিমান হামলার মাধ্যমে নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে বলা হয়, ইসলামী জঙ্গী সংগঠন আল-কায়দা এ হামলা চালিয়েছে। সংগঠনটির প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে এ হামলার জন্য দায়ী করে তাকে হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র গোটা আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে তছনছ করে দেয়। অথচ পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রেরই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিয়েছে, এ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র স্বয়ং। যুক্তরাষ্ট্র এ কাজটি করেছিল মূলত ইসলামকে দোষারোপ এবং হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলোকে অস্থিতিশীল ও ধ্বংস করে দেয়ার জন্য। বছরের পর বছর ধরে লাদেনকে ধরার নামে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। লাদেন পর্বের পরিসমাপ্তি ঘটায় পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে অভিযান চালিয়ে তাকে হত্যার মাধ্যমে। বলা হয়, আল কায়দা সৃষ্টির নেপথ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল। দেশটি প্রয়োজন অনুযায়ী আল-কায়দাকে দিয়ে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে দেয়। প্রয়োজন শেষ হওয়ায় লাদেন পর্বের সমাপ্তি টেনে সৃষ্টি করে ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার নামে আইএস নামক সংগঠন। এ সংগঠনের নামে মানুষের শিরñেদের ভিডিও ও স্থিরচিত্র সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে দেখানো হয়, ইসলাম জঙ্গী ও সন্ত্রাসের ধর্ম। বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র আইএসকে যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখবে। প্রয়োজন ফুরালে আইএসকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। এ আলামত এখনই দেখা যাচ্ছে। আইএস ধ্বংসে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালী দেশগুলো একযোগে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আইএস এখন অনেকটাই কোনঠাসা। এর ধ্বংস সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী দেশগুলো যে নীতি গ্রহণ করেছে, এ নীতির ধারাবাহিকতায় দেখা যাবে, আইএস-এর পর পথভ্রষ্ট একশ্রেণীর মুসলমানদের নিয়ে হয়তো নতুন কোনো সংগঠন বা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে। অর্থাৎ মুসলমান ও ইসলামের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দেশগুলো একজোট হয়ে যে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রমাগত এই ষড়যন্ত্রের মধ্যেই ইসলামের প্রতি মানুষের আকর্ষণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় অন্য ধর্ম থেকে মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে। 
তিন.
মুসলমান নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যা ও গণহত্যার মতো ঘটনায় মানবতা লঙ্ঘনের বিষয়টি অনুচ্চারিতই থেকে যায়। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো কখনোই মানবতার বিষয়টি উত্থাপন করেনি। অথচ মুসলমান বাদে অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রে পান থেকে চুন খসলেই তারা হায় হায় করে উঠে। এই যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা চালাচ্ছে, এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রসহ প্রতিবেশি ভারত, চীন, রাশিয়া একেবারে নিশ্চুপ রয়েছে। মানবতাবিরোধী এই অপরাধের ব্যাপারে তারা টুঁ শব্দটি করছে না। তাদের আচরণে স্পষ্ট, মুসলমান মারলে মানবতা লঙ্ঘিত হয় না। এটাই যেন স্বাভাবিক। রোহিঙ্গা মুসলমান গণহত্যায় মানবাধিকার বিষয়ে তাদের মৌণতা থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘসহ কিছু দেশ ও সংস্থা মুখে মুখে গণহত্যা বলেই খালাস হয়ে যাচ্ছে। মানুষ নিধন বন্ধে ত্বরিৎ কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করছে না। তাদের বক্তব্য সর্বস্ব লিপ সার্ভিসের সুযোগে মিয়ানমারও রোহিঙ্গাদের মেরে-কেটে, বিতাড়ন করে সাফ করে দিচ্ছে। ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র আমরা দেখি। সেখানে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী ফিলিস্তিনীদের অত্যাচার, নির্যাতন ও গুলি করে হত্যা করলেও পশ্চিমা দেশগুলো কোনো ধরনের প্রতিবাদ করে না। অর্থাৎ বিশ্বের যে প্রান্তেই মুসলমানরা হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হোক না কেন, তাতে পশ্চিমা দেশগুলো যেন খুশি হয়। রোহিঙ্গাদের উপর মায়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে তারা উচ্চবাচ্য করছে না। ত্রাণ সহযোগিতা ছাড়া হত্যা ও নির্যাতন বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কেবল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভ্রাতিত্ববোধ এবং মানবিক টানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রতিবাদে সোচ্চার হলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না। বরং নবোদ্যমে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ রোহিঙ্গাদের প্রতি যে মমত্ববোধ দেখাচ্ছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশে একশ্রেণীর সুশীল মানুষ নীরব হয়ে রয়েছেন। অথচ এই তারাই দেশে সংখ্যালঘুদের উপর দুষ্কৃতিকারীদের হামলা হলে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেন। মানবতা লঙ্ঘন, সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে বলে সভা-সেমিনার করে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে তোলপাড় অবস্থার সৃষ্টি করেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হন। পার্শ্ববর্তী ভারতের লোকজনও মিছিল করে সীমান্ত পর্যন্ত চলে আসে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ বিবৃতি দেয়া শুরু করে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান যে গণহত্যার শিকার এবং নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, এ ব্যাপারে তারা প্রত্যেকেই যেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। এদেশের তথাকথিত সুশীলদের মুখ থেকে আজ পর্যন্ত লিপ সার্ভিসও পাওয়া যায়নি। মুসলমান নিহত ও নিপীড়িত হচ্ছে বলেই কি তাদের এ নীরবতা? নাকি রোহিঙ্গাদের পক্ষে কথা বললে তাদের মান-সম্মান বলে কিছু থাকবে না? প্রগতিশীলতা বিনষ্ট হয়ে যাবে? তাদের এ ‘স্পিকটি নট’ অবস্থা পর্যবেক্ষণে বুঝতে অসুবিধা হয় না, সা¤্রাজ্যবাদী এবং মুসলমান বিরোধী শক্তি ও তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাদের হাবভাবে এটাই প্রকাশিত হচ্ছে, প্রগতিশীল বলতে তারা কেবল মুসলমানদের বিপক্ষে কথা বলাকেই বোঝেন। এক্ষেত্রে মুসলমানদের মানবিকতা ক্ষুন্ন হলেও তাদের কিছু যায় আসে না। তথাকথিত এই প্রগতিশীলদের চরিত্র দেশের মানুষ বুঝে গেছে। তাদের কাছে মানবতা বলতে যে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রকে বোঝায়, তা পরিস্কার হয়ে গেছে। 
চার.
মুসলমানদের বিরুদ্ধে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর শত নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, উচ্ছেদের মাঝেও ইসলামের প্রতি দিন দিন মানুষের যে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে এটাই প্রতীয়মাণ হয়, আগামী বিশ্বে মুসলমানরাই আধিপত্য বিস্তার করবে। পশ্চিমাদেরই বিভিন্ন সংস্থার করা জরিপে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে এ কথা সত্য, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো যদি সারাবিশ্বের মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতো এবং মুসলমানদের বিপদে পাশে দাঁড়াতো, তবে সা¤্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে লাগাতার ষড়যন্ত্র করার সুযোগ সৃষ্টি হতো না। দুঃখের বিষয়, ধন-সম্পদে সমৃদ্ধ মুসলমান দেশগুলো পশ্চিমাদের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদেরই ক্ষতি সাধন করে চলেছে। পশ্চিমাদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির কাছে পরাস্ত হয়ে চলেছে। তাদের আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণেই পশ্চিমারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অঘোষিত ‘ক্রুসেড’ চালানোর সুযোগ পাচ্ছে। ইসলাম ও মুসলমান ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে যদি তারা কাজ করত, তবে আজকের বিশ্বে মুসলমানরাই দিক নির্দেশক হয়ে উঠত। রোহিঙ্গাদের আজ যে দুর্গতি, তার বিরুদ্ধে মুসলমান রাষ্ট্রগুলো যদি সমস্বরে কথা বলতো এবং হুশিয়ারি উচ্চারণ করতো, তবে মিয়ানমারের মতো রাষ্ট্রের পক্ষে ঘোষণা দিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমান নিধন ও উচ্ছেদ করা সম্ভব হতো না। এটা সম্ভব হচ্ছে, মুসলমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার অনৈক্যের কারণে। বিশেষ করে দেশগুলোর রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত, তাদের নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং ক্ষমতায় থাকার উদগ্রীবতার কারণে। তবে এ কথা বলা যায়, সারাবিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এ ধারা থেকেই ইসলাম ও মুসলমানদের মর্যাদা তুলে ধরার জন্য কোনো না কোনো নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটবেই। এ নিবন্ধ শেষ করবো, লিবিয়ার অবিসংবাদিত নেতা গাদ্দাফির জীবনের শেষ ভাষণের কিছু অংশ উল্লেখ করে। তিনি লিবিয়ার জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, আজ আমি আর্মি ইতিহাসের সর্বসেরা আক্রমণের মুখে। আফ্রিকার ক্ষুদে শিশু ওবামা আমাকে হত্যা করতে চায়। আমার দেশের স্বাধীনতা হরণ করতে, আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করতে, আমাদের ফ্রি হাউজিং, ফ্রি মেডিসিন, ফ্রি এডুকেশন, ফ্রি ফুড কর্মসূচি বাতিল করতে চায়। আমি আপস করবো না এবং আল্লাহ চাইলে আল্লাহর পথেই মৃত্যুবরণ করব, যে পথ আমার দেশকে ধনী বানিয়েছে, কৃষিতে সমৃদ্ধ করেছে, খাদ্য-স্বাস্থ্য উন্নত করেছে, আর আমাদের আরব-আফ্রিকার অসহায় ভাই-বোনদের সাহায্য করার সুযোগ দিয়েছে, সেই পথ ত্যাগ করে আপস করার কোনো মানে হয় না। আমি মরতে চাই না। তবে সেদিন এলে, আমার কথাগুলো ছড়িয়ে দিও সারাবিশ্বে। আমার আজকের বক্তৃতাকেই আমার উইল হিসেবে ধরে নাও। জানিয়ে দাও সারাবিশ্বকে যে, আমি ন্যাটোর ক্রুসেডার হামলার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম, অমানবিকতা, বিশ্বাসঘাতকতা, পশ্চিমা উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। আর ছিলাম আফ্রিকান-আরবদের পাশে আলোর রেখা হয়ে। আমরা স্বাধীন জাতি। এই স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার শপথ করলাম। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে স্বাধীনতা আর দেশ রক্ষা করে যাবো। ভাই ও বোনেরা, এক অপরকে ভালবাসতে শিখুন, রক্তপাত বন্ধ করুন। কারণ আমেরিকা, ইউরোপ আর তাদের মিত্ররা কখনো আফ্রিকার বুকে সূর্যের আলো দেখতে চায় না।