বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মুসলিম জাতী

559

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞান মানব সভ্যতাকে আজ বহুদূরে এগিয়ে নিয়ে গেছে। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। একদিন পৃথিবীতে যেসব জাতির কোনো পরিচয় ছিল না, তারা এই জ্ঞানের সুবাদে নিজেদের সকল দীনতা-হীনতা ও পরাধীনতা দূর করে আজ নিজেদের বস্তু জীবনকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করেছে। অপরদিকে যে সমস্ত জাতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞানকে উপেক্ষা করে এ ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে, তারা একসময় বিশ্বের নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের শীর্ষে অবস্থান করলেও আজ পরমুখাপেক্ষী। নিজেদের জীবন-মানকে উন্নত করার সকল উপায়-উপকরণ ও নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেও অপরের দ্বারে হাত পাতা ছাড়া তাদের উপায় থাকছে না। অভিন্ন কারণেই তারা শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই বর্তমান প্রতিযোগিতাশীল বিশ্বে অস্থির ও অস্বস্তিকর জীবন যাপন করছে না, নিজেদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষায়ও তাদেরকে সামরিক সাহায্যের জন্য অপরের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। ফলে এই মুখাপেক্ষিতা নিজস্ব জীবনাদর্শ, জীবন চেতনা, ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকেও তাদেরকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে তাদেরকে করে তুলছে পরিচয়হীন। বলা বাহুল্য, আজকের মুসলিম বিশ্ব যাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, জনসম্পদ এবং ভৌগোলিক সহাবস্থানের সম্পদ সবকিছু থাকা সত্ত্বেও একমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞানে পিছিয়ে পড়ে থাকায় তারা এসব জ্ঞানে সমৃদ্ধ দেশসমূহের মুখাপেক্ষী। নিজেদের প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবজনিত এই সমস্যার দরুন এখন মুসলমানদের নিজস্ব এমন অনেক কিছুই হারাতে হচ্ছে যেগুলো তাদের জাতিসত্তার পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞানে সমৃদ্ধ দেশসমূহের জীবনধারা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ইত্যাদি ইসলামী জীবনধারার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো লক্ষ্যে-অলক্ষ্যে মুসলিম সমাজের আধুনিক প্রজন্মকে ভিন্ন দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ একদিন মুসলিম মনীষীরাই ছিলেন আজকের প্রযুক্তি জ্ঞানে সমৃদ্ধ এ সকল দেশের পথিকৃৎ কিন্তু নানা কারণে সেসবের বিচ্যুতি আজ মুসলমানদেরকে নিজেদের শিষ্যদেরই শিষ্যত্ব গ্রহণে বাধ্য করছে। নিজেদের বৈষয়িক উন্নতি সাধন এবং আপন সেই হৃদ মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হলে মুসলমানদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞানলাভে এগিয়ে আসতেই হবে। পবিত্র কুরআনে সর্বস্রষ্টা তার সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করার তাগিদ দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘তোমাদের কল্যাণেই আসমান-জমিনের সকল কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে’। সেই কল্যাণ লাভের গবেষণা করতে হবে। বস্তুত এই ঐতিহাসিক প্রয়োজনের তাগিদই বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বার বার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং প্রাত্যহিক জীবনে দৃঢ় প্রত্যয়, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে এর প্রয়োগের মাধ্যমে মুসলিম জাতির অতীত ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার আহবান। আমাদের রয়েছে গৌরবময় অতীত। আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি যে, একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। মুসলিম পন্ডিতগণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপন করে জ্ঞান ও মানবিক উৎকর্ষের দিগন্তকে সম্প্রসারিত করেছিলেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মুসলমানদের এই বিশাল অবদান ছাড়া পশ্চিমের শিল্পবিপ্লব সম্ভবপর ছিল না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য যেসব ছাত্র আসে, তাদের রয়েছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে ঐতিহ্য সম্পৃক্তি। ইসলামে বিশ্বাস তাদের দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। আমরা প্রত্যাশা নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছি। এটি আজ মুসলিম জাতির জন্য অতীব প্রয়োজন। বিশেষ করে আমাদের ন্যায় উন্নয়নশীল সেসব দেশ, যেগুলোর নিজস্ব বহু প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে সেইসব সম্পদকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।